ঢাকা ০৭:৪১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

এলপিজি সংকট: রান্নার আগুন নিভে গেলে রাষ্ট্রের দায় কোথায়?

ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

বাংলাদেশের নগর ও আধা-নগর জীবনে রান্নাঘরের চুলা এখন আর কেবল একটি গৃহস্থালি উপকরণ নয়; এটি জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে দৃশ্যমান ও দৈনন্দিন সূচক। এই সূচকই সাম্প্রতিক সময়ে বিপজ্জনকভাবে নিচের দিকে নেমে গেছে। “টাকা দিয়েও গ্যাস পাচ্ছি না”- এই অভিযোগ শুধু ক্ষুব্ধ ভোক্তার দীর্ঘশ্বাস নয়; এটি রাষ্ট্রের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রকাশ। রান্নার আগুন যখন নিভে যায়, তখন তা কেবল একটি পরিবারের সমস্যা থাকে না; তা সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রশ্নে পরিণত হয়।
দেশজুড়ে এলপিজি সিলিন্ডার সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে সামনে এসেছে এলপিজি ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট। কমিশন বৃদ্ধি, দাম নির্ধারণ পদ্ধতিতে পরিবর্তনসহ ছয় দফা দাবিতে তারা বিক্রি বন্ধ রাখেন। পরে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সঙ্গে বৈঠকের পর ধর্মঘট প্রত্যাহার হলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমেনি। বাজারে সিলিন্ডার ফিরতে সময় লেগেছে, অনেক জায়গায় এখনও সংকট রয়ে গেছে। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে- এই সমস্যার শিকড় ধর্মঘটের চেয়েও অনেক গভীরে প্রোথিত।
প্রশ্ন হলো, একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি কীভাবে এত সহজে বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়? রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক কাঠামো কোথায় ছিল, যখন সরবরাহব্যবস্থা কয়েক দিনের মধ্যেই ভেঙে পড়ল? একটি কার্যকর জ্বালানি নিরাপত্তা নীতি থাকলে কি এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা?
প্রাকৃতিক গ্যাসের নতুন সংযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শহরের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে এলপিজি আর কোনো বিলাসপণ্য নয়; এটি অপরিহার্য বাস্তবতা। সরকারি হিসাবেই দেখা যায়, দেশের অধিকাংশ নতুন পরিবার এখন এলপিজিনির্ভর। রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র খাদ্যব্যবসা, হোস্টেল ও মেস- সবখানেই এলপিজি দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে এই খাতে সামান্য অস্থিরতাও সরাসরি খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলে।
এলপিজি সংকটের ফলে অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে আবার কাঠের চুলা, কয়লার উনুন বা অনিরাপদ বৈদ্যুতিক চুলার দিকে ঝুঁকছেন। এটি একদিকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর- কার্বন নিঃসরণ ও বায়ুদূষণ বাড়ায়- অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ড ও বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি করে। রান্নাঘরের নিরাপত্তা যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন তার প্রভাব নারীদের স্বাস্থ্য, শিশুদের পুষ্টি ও সামগ্রিক পরিবারিক নিরাপত্তার ওপরও পড়ে। অথচ জ্বালানি রূপান্তর ও টেকসই উন্নয়নের নামে যে অগ্রগতির গল্প দেশ বলছে, এই বাস্তব চিত্র তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে, যার ঘোষিত উদ্দেশ্য ভোক্তা সুরক্ষা। আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামা বিবেচনায় এনে একটি সমন্বিত মূল্য কাঠামো ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো- এই ঘোষিত দামে অনেক জায়গায় সিলিন্ডারই পাওয়া যায় না। কোথাও অতিরিক্ত দাম নেওয়া হয়, কোথাও ‘স্টক নেই’ অজুহাতে বিক্রি বন্ধ থাকে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে নিয়ন্ত্রণ থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ।
এখানেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দাম নির্ধারণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; সেই দাম বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না, মজুতদারি বা সরবরাহ বন্ধের মাধ্যমে বাজারকে জিম্মি করা হচ্ছে কি না- এসব দেখার জন্য শক্তিশালী নজরদারি ও প্রয়োগক্ষমতা প্রয়োজন। এলপিজি বাজারে সেই নজরদারির ঘাটতি যে দীর্ঘদিনের, চলমান সংকট তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
অন্যদিকে, এলপিজি ব্যবসায়ীদের দাবিগুলোর পেছনে কিছু বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দামের ওঠানামা, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন- সব মিলিয়ে এই খাতটি চাপের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু সেই চাপের সমাধান আলোচনার টেবিলে হওয়া উচিত, রান্নাঘর অচল করে নয়। ভোক্তার চুলা বন্ধ রেখে দাবি আদায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে না।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ কি ধর্মঘটের আওতায় পড়তে পারে? খাদ্য, ওষুধ বা জ্বালানির মতো পণ্যের ক্ষেত্রে বাজার পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া কি নৈতিক ও আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য? যদি পড়ে, তবে সেটি বাজার অর্থনীতির ব্যর্থতা নয় কি? রাষ্ট্র যদি আগেই একটি স্পষ্ট নীতিগত কাঠামো তৈরি করত- যেখানে ন্যূনতম সরবরাহ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকত- তাহলে ব্যবসায়ী ও ভোক্তার এই সংঘাত এতটা তীব্র হতো না।
বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তা বলতে সাধারণত বিদ্যুৎ উৎপাদন, কয়লা বা এলএনজি আমদানির কথাই বেশি আলোচিত হয়। বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেগাওয়াট হিসাব, উৎপাদন সক্ষমতা- এসব আলোচনায় রান্নার জ্বালানি প্রায় উপেক্ষিত থেকে যায়। অথচ প্রতিদিনের জীবনে সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব ফেলে এই খাতটিই। একটি পরিবারে বিদ্যুৎ কয়েক ঘণ্টা না থাকলে অসুবিধা হয়; কিন্তু রান্নার জ্বালানি না থাকলে পুরো দৈনন্দিন জীবন স্থবির হয়ে পড়ে।
এলপিজির মতো একটি খাত যদি সপ্তাহজুড়ে অচল হয়ে পড়তে পারে, তাহলে ভবিষ্যতের আরও বড় জ্বালানি সংকটে আমাদের প্রস্তুতির মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। এটি কেবল সরবরাহের সমস্যা নয়; এটি নীতি, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির সমন্বিত ব্যর্থতা।
সমাধানের দিকনির্দেশনা তাই স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি- দুই স্তরেই ভাবতে হবে। স্বল্পমেয়াদে এলপিজিকে কার্যকরভাবে ‘জরুরি পণ্য’ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও ধর্মঘটের মাধ্যমে সরবরাহ বন্ধের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বিইআরসি ঘোষিত দামে বিক্রি নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় তদারকি, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ভোক্তা অভিযোগ নিষ্পত্তির দ্রুত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, পূর্বানুমেয় ও অংশগ্রহণমূলক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা- যেখানে সরকার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তার স্বার্থের ভারসাম্য থাকবে। এলপিজি আমদানিতে বৈচিত্র্য, মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরবরাহ চেইনে প্রতিযোগিতা বাড়ানোও জরুরি। পাশাপাশি বিদ্যুৎভিত্তিক নিরাপদ রান্না প্রযুক্তি, বায়োগ্যাসসহ বিকল্প জ্বালানির প্রসার ছাড়া এলপিজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো সম্ভব নয়। জ্বালানি রূপান্তর যদি সত্যিই টেকসই করতে হয়, তবে রান্নার জ্বালানিকে সেই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।
এলপিজি সংকট আমাদের মনে করিয়ে দেয়- নীতি যদি বাস্তবতার সঙ্গে তাল না মেলায়, আর নিয়ন্ত্রণ যদি শুধু বিজ্ঞপ্তিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ভোক্তা বারবার জিম্মি হবে। “টাকা দিয়েও গ্যাস না পাওয়া” যেন কোনো স্বাভাবিক অভিজ্ঞতায় পরিণত না হয়- সেই দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। এখনই, দেরি হওয়ার আগেই।

ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক কলামিস্ট ও মানবাধিকারকর্মী

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৯:৩৭:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬
৪৬০৩ বার পড়া হয়েছে

ধানের শীষে ভোট দিন

এলপিজি সংকট: রান্নার আগুন নিভে গেলে রাষ্ট্রের দায় কোথায়?

আপডেট সময় ০৯:৩৭:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের নগর ও আধা-নগর জীবনে রান্নাঘরের চুলা এখন আর কেবল একটি গৃহস্থালি উপকরণ নয়; এটি জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে দৃশ্যমান ও দৈনন্দিন সূচক। এই সূচকই সাম্প্রতিক সময়ে বিপজ্জনকভাবে নিচের দিকে নেমে গেছে। “টাকা দিয়েও গ্যাস পাচ্ছি না”- এই অভিযোগ শুধু ক্ষুব্ধ ভোক্তার দীর্ঘশ্বাস নয়; এটি রাষ্ট্রের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রকাশ। রান্নার আগুন যখন নিভে যায়, তখন তা কেবল একটি পরিবারের সমস্যা থাকে না; তা সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রশ্নে পরিণত হয়।
দেশজুড়ে এলপিজি সিলিন্ডার সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে সামনে এসেছে এলপিজি ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট। কমিশন বৃদ্ধি, দাম নির্ধারণ পদ্ধতিতে পরিবর্তনসহ ছয় দফা দাবিতে তারা বিক্রি বন্ধ রাখেন। পরে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সঙ্গে বৈঠকের পর ধর্মঘট প্রত্যাহার হলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমেনি। বাজারে সিলিন্ডার ফিরতে সময় লেগেছে, অনেক জায়গায় এখনও সংকট রয়ে গেছে। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে- এই সমস্যার শিকড় ধর্মঘটের চেয়েও অনেক গভীরে প্রোথিত।
প্রশ্ন হলো, একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি কীভাবে এত সহজে বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়? রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক কাঠামো কোথায় ছিল, যখন সরবরাহব্যবস্থা কয়েক দিনের মধ্যেই ভেঙে পড়ল? একটি কার্যকর জ্বালানি নিরাপত্তা নীতি থাকলে কি এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা?
প্রাকৃতিক গ্যাসের নতুন সংযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শহরের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে এলপিজি আর কোনো বিলাসপণ্য নয়; এটি অপরিহার্য বাস্তবতা। সরকারি হিসাবেই দেখা যায়, দেশের অধিকাংশ নতুন পরিবার এখন এলপিজিনির্ভর। রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র খাদ্যব্যবসা, হোস্টেল ও মেস- সবখানেই এলপিজি দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে এই খাতে সামান্য অস্থিরতাও সরাসরি খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলে।
এলপিজি সংকটের ফলে অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে আবার কাঠের চুলা, কয়লার উনুন বা অনিরাপদ বৈদ্যুতিক চুলার দিকে ঝুঁকছেন। এটি একদিকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর- কার্বন নিঃসরণ ও বায়ুদূষণ বাড়ায়- অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ড ও বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি করে। রান্নাঘরের নিরাপত্তা যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন তার প্রভাব নারীদের স্বাস্থ্য, শিশুদের পুষ্টি ও সামগ্রিক পরিবারিক নিরাপত্তার ওপরও পড়ে। অথচ জ্বালানি রূপান্তর ও টেকসই উন্নয়নের নামে যে অগ্রগতির গল্প দেশ বলছে, এই বাস্তব চিত্র তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে, যার ঘোষিত উদ্দেশ্য ভোক্তা সুরক্ষা। আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামা বিবেচনায় এনে একটি সমন্বিত মূল্য কাঠামো ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো- এই ঘোষিত দামে অনেক জায়গায় সিলিন্ডারই পাওয়া যায় না। কোথাও অতিরিক্ত দাম নেওয়া হয়, কোথাও ‘স্টক নেই’ অজুহাতে বিক্রি বন্ধ থাকে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে নিয়ন্ত্রণ থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ।
এখানেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দাম নির্ধারণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; সেই দাম বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না, মজুতদারি বা সরবরাহ বন্ধের মাধ্যমে বাজারকে জিম্মি করা হচ্ছে কি না- এসব দেখার জন্য শক্তিশালী নজরদারি ও প্রয়োগক্ষমতা প্রয়োজন। এলপিজি বাজারে সেই নজরদারির ঘাটতি যে দীর্ঘদিনের, চলমান সংকট তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
অন্যদিকে, এলপিজি ব্যবসায়ীদের দাবিগুলোর পেছনে কিছু বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দামের ওঠানামা, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন- সব মিলিয়ে এই খাতটি চাপের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু সেই চাপের সমাধান আলোচনার টেবিলে হওয়া উচিত, রান্নাঘর অচল করে নয়। ভোক্তার চুলা বন্ধ রেখে দাবি আদায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে না।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ কি ধর্মঘটের আওতায় পড়তে পারে? খাদ্য, ওষুধ বা জ্বালানির মতো পণ্যের ক্ষেত্রে বাজার পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া কি নৈতিক ও আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য? যদি পড়ে, তবে সেটি বাজার অর্থনীতির ব্যর্থতা নয় কি? রাষ্ট্র যদি আগেই একটি স্পষ্ট নীতিগত কাঠামো তৈরি করত- যেখানে ন্যূনতম সরবরাহ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকত- তাহলে ব্যবসায়ী ও ভোক্তার এই সংঘাত এতটা তীব্র হতো না।
বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তা বলতে সাধারণত বিদ্যুৎ উৎপাদন, কয়লা বা এলএনজি আমদানির কথাই বেশি আলোচিত হয়। বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেগাওয়াট হিসাব, উৎপাদন সক্ষমতা- এসব আলোচনায় রান্নার জ্বালানি প্রায় উপেক্ষিত থেকে যায়। অথচ প্রতিদিনের জীবনে সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব ফেলে এই খাতটিই। একটি পরিবারে বিদ্যুৎ কয়েক ঘণ্টা না থাকলে অসুবিধা হয়; কিন্তু রান্নার জ্বালানি না থাকলে পুরো দৈনন্দিন জীবন স্থবির হয়ে পড়ে।
এলপিজির মতো একটি খাত যদি সপ্তাহজুড়ে অচল হয়ে পড়তে পারে, তাহলে ভবিষ্যতের আরও বড় জ্বালানি সংকটে আমাদের প্রস্তুতির মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। এটি কেবল সরবরাহের সমস্যা নয়; এটি নীতি, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির সমন্বিত ব্যর্থতা।
সমাধানের দিকনির্দেশনা তাই স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি- দুই স্তরেই ভাবতে হবে। স্বল্পমেয়াদে এলপিজিকে কার্যকরভাবে ‘জরুরি পণ্য’ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও ধর্মঘটের মাধ্যমে সরবরাহ বন্ধের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বিইআরসি ঘোষিত দামে বিক্রি নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় তদারকি, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ভোক্তা অভিযোগ নিষ্পত্তির দ্রুত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, পূর্বানুমেয় ও অংশগ্রহণমূলক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা- যেখানে সরকার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তার স্বার্থের ভারসাম্য থাকবে। এলপিজি আমদানিতে বৈচিত্র্য, মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরবরাহ চেইনে প্রতিযোগিতা বাড়ানোও জরুরি। পাশাপাশি বিদ্যুৎভিত্তিক নিরাপদ রান্না প্রযুক্তি, বায়োগ্যাসসহ বিকল্প জ্বালানির প্রসার ছাড়া এলপিজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো সম্ভব নয়। জ্বালানি রূপান্তর যদি সত্যিই টেকসই করতে হয়, তবে রান্নার জ্বালানিকে সেই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।
এলপিজি সংকট আমাদের মনে করিয়ে দেয়- নীতি যদি বাস্তবতার সঙ্গে তাল না মেলায়, আর নিয়ন্ত্রণ যদি শুধু বিজ্ঞপ্তিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ভোক্তা বারবার জিম্মি হবে। “টাকা দিয়েও গ্যাস না পাওয়া” যেন কোনো স্বাভাবিক অভিজ্ঞতায় পরিণত না হয়- সেই দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। এখনই, দেরি হওয়ার আগেই।

ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক কলামিস্ট ও মানবাধিকারকর্মী