ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে প্রণোদনা, ২০২৬-২৭ বাজেটকে স্বাগত ব্যবসায়ীদের
ঢাকা, নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে একগুচ্ছ কর ও শুল্ক সুবিধার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কর প্রশাসন সহজীকরণ, ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
প্রস্তাবিত বাজেটে নগদ সহায়তার ওপর আয়কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি উৎসে কর ১ শতাংশ এবং করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যা ব্যবসা খাতে নীতিগত স্থিতিশীলতার বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সরাসরি রপ্তানিতে উৎসাহ দিতে নতুন এসআরও জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রত্যক্ষ রপ্তানিকারকরা দেশীয় সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারবেন। এছাড়া বন্ড সুবিধার আওতা সম্প্রসারণের প্রস্তাবও এসেছে, যা রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনাকে আরও সহজ করবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কর ছাড়
পরিষ্কার জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্রপাতি আমদানিতে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত শুল্ক ও কর অব্যাহতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাটারি শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান সুবিধার মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর শিল্প গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে।
শিল্প খাতের ব্যয় কমানোর উদ্যোগ
শিল্পের কাঁচামাল আমদানির সাধারণ শুল্কহার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিকের ওপর সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিক আমদানিতে শুল্ক অব্যাহতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
সরকারের আশা, এসব পদক্ষেপ শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াবে।
কর ব্যবস্থাপনায় সংস্কার
ব্যবসা সহজীকরণের অংশ হিসেবে মাসিক ভ্যাট রিটার্নের পরিবর্তে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ব্যবসায়িক খরচের গ্রহণযোগ্য সীমা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতে উৎসে কর কমানোর প্রস্তাবও রয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামাল এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ আয়ের ওপর উৎসে কর কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ
প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। জমি, ভবন বা ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে দলিলমূল্যের চেয়ে বেশি লেনদেনমূল্য থাকলে অতিরিক্ত অর্থ ঘোষণা করে নিয়মিত হারে কর পরিশোধের মাধ্যমে তা বৈধ করা যাবে।
তবে এ বিষয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও আব্দুর রহমান খান দাবি করেছেন, এটি কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নয়; বরং প্রকৃত লেনদেনমূল্য প্রকাশে করদাতাদের উৎসাহিত করার একটি সীমিত ব্যবস্থা।
বিনিয়োগ অনুমোদনে দ্রুততা
অনলাইনে ব্যবসা নিবন্ধন ও লাইসেন্স গ্রহণের জন্য ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। কোম্পানি নিবন্ধনের সময়সীমা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ করার পাশাপাশি ইউটিলিটি সংযোগ পাওয়ার সময়ও কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকার আশা করছে, এসব সংস্কার দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ব্যবসায়ী নেতাদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট ব্যবসাবান্ধব ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হবে। তবে সফলতা নির্ভর করবে সঠিক বাস্তবায়নের ওপর।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, করব্যবস্থার সংস্কার ও সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর সুবিধা সম্প্রসারণ শিল্প খাতের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বাজেটকে সংস্কারমুখী ও ব্যবসাবান্ধব আখ্যা দিয়েছেন।
এছাড়া ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বাজেটের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে ঘোষিত সংস্কার ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
বড় বাজেট, বড় চ্যালেঞ্জ
প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাজেট। এতে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ধরা হয়েছে। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থায়ন এবং ঘোষিত সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা।