তেহরান কিন্তু কারাকাস নয়
কেন ট্রাম্পের ‘রেজিম চেঞ্জ’ কৌশল ইরানে কাজ করবে না
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যখন ঘোষণা করলেন, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করলে যুক্তরাষ্ট্র ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’। অর্থাৎ প্রস্তুত। তখন তার কথার একটি বিশেষ তীক্ষ্ণ বার্তা ছিল। তার ২৪ ঘণ্টা পরই যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী কারাকাসে অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তার বাড়ি থেকে অপহরণ করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ‘নারকো-টেররিজম’ বা মাদক সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে। ভেনেজুয়েলাকে দেয়া হুমকিকে বাস্তবে রূপ দিয়ে ট্রাম্প আসলে ইরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ আরও বাড়িয়ে তুলেছেন। ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে অবিবেচক ও বিপজ্জনক’ বলে অভিহিত করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। স্পষ্টতই ইরানি সরকার সতর্ক বার্তাটি বুঝতে পেরেছে। তবে ইরান ভেনেজুয়েলা নয়। যে ঘটনা শনিবার কারাকাসে ঘটেছে, সেটি তেহরানে ঘটানো প্রায় অসম্ভব।
শক্তিশালী সামরিক অবকাঠামো
যে সব বাস্তবতা ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন সম্ভব করেছে সেগুলোই দেখিয়ে দেয় কেন ইরানে একই ধরনের হস্তক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কার্যত অসম্ভব। কারাকাসে অভিযানের আগের ছয় মাস যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ গোপনে কাজ করেছে। তাদের কাছে মাদুরোর খুব কাছের একজন সূত্র ছিল, যিনি মাদুরোর গতিবিধি নজরে রাখতে সাহায্য করেন। শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান কারাকাস ও আশপাশের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এরপর বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা মাদুরোকে তার বাসভবন থেকে তুলে নিয়ে যায়। এই অভিযানের সফলতার বড় কারণ ছিল- ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনীর বিশৃঙ্খলা এবং রাশিয়া ও চীনের পক্ষ থেকে মাদুরোর প্রতি কার্যত সরে দাঁড়ানো।
অন্যদিকে, ছয় মাস আগেই ইরান প্রমাণ করেছে তাকে রেজিম চেঞ্জের লক্ষ্য বানানো এত সহজ নয়। জুন মাসে ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতে তেহরানের দুর্বলতা যেমন প্রকাশ পেয়েছিল, তেমনি তাদের দৃঢ়তার প্রমাণও মিলেছিল। ইসরাইলের আকস্মিক হামলায় আইআরজিসি (ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী)-এর গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের হত্যা করা হয়। এমনকি বিভিন্ন কর্মকর্তাকে ভয় দেখিয়ে দলে টানার মনস্তাত্ত্বিক কৌশলও প্রয়োগ করা হয়। তবু ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান নতি স্বীকার করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের বাঙ্কার-বাস্টার বোমা দিয়ে ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাতও শাসনব্যবস্থাকে কাঁপাতে পারেনি। বরং প্রতিক্রিয়ায় ইরানি সামরিক বাহিনী শত শত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে- যেগুলো ইসরাইলের আয়রন ডোম ভেদ করে সামরিক স্থাপনা আঘাত করে। এই দৃঢ়তার উৎস হলো বহির্বিশ্বের ধাক্কা থেকে নিজেকে আলাদা রাখার নীতি। নির্মাণ, টেলিযোগাযোগ ও রপ্তানি খাতে আইআরজিসির বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য, যার মূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার, তার শীর্ষ কমান্ডারদেরকে শাসন টিকে থাকার সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বার্থে গভীরভাবে যুক্ত করেছে, মতাদর্শিক প্রশ্ন ছাপিয়ে। ইরান অঞ্চলটির সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি এক মিলিয়ন সক্রিয় ও রিজার্ভ সেনা রয়েছে। আইআরজিসিরই সদস্য কমপক্ষে দেড় লাখ। তাদের অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যের নানা যুদ্ধে অভিজ্ঞ। এর সঙ্গে আছে বেসিজ মিলিশিয়া। এর সদস্যসংখ্যাও লাখ লাখ। ইরানে আক্রমণ চালালে তা ভেনেজুয়েলার মতো হবে না। এমনকি ইরাকের মতোও নয়। পাহাড়ি ভূসংস্থান ও বিশাল নগরায়ন এটিকে আরও কঠিন করে তোলে। তার ওপর চীন ও রাশিয়া ইরানকে ভেনেজুয়েলার মতো ফেলে দেবে এমন সম্ভাবনা কম। বরং তারা উন্নত গোয়েন্দা সহায়তা, অস্ত্র ও রাজনৈতিক সুরক্ষা দেবে বলেই সম্ভাবনা বেশি।
সামাজিক অস্থিরতা
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত হয়ে ইরানে গণবিক্ষোভ হচ্ছে। কিন্তু এটি হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রত্যাশিত সুযোগে পরিণত নাও হতে পারে। এখনও পরিস্থিতি ২০২২ সালের বিক্ষোভের মাত্রায় পৌঁছায়নি। কয়েক দিনে ২০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেনছ। কিন্তু এখনো শাসনব্যবস্থায় দৃশ্যমান কোনো বড় ফাটল ধরা পড়েনি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আইআরজিসিতে এখনো এমন কোনো বড় পাল্টা অবস্থান বা ভাঙন দেখা যায়নি, যা পুরো ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে পারে। উল্টো ইতিহাস দেখায় যে, বাইরের আগ্রাসন সমাজকে ভাঙে না, বরং ঐক্যবদ্ধ করে। গত গ্রীষ্মে ইসরাইলের উসকানিমূলক প্রচারে ইরানিরা সরকারবিরোধী ঐক্যভাঙা ফাঁদে পা দেয়নি, সেটিই তার প্রমাণ। দমনপীড়ন চালালেও তেহরানের কর্তৃপক্ষ প্রতিবাদকারীদের উদ্বেগ পুরোপুরি অস্বীকারও করছে না। শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেন, ‘বাজারিদের প্রতিবাদ একটি যৌক্তিক প্রতিবাদ’ এবং সরকার ‘সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে।’
নিশ্চয়ই ইরানের সংকট বাস্তব- ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা, মুদ্রাস্ফীতি, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ, সর্বোচ্চ নেতার স্বাস্থ্য ও উত্তরাধিকারের প্রশ্ন- এগুলো শাসনব্যবস্থায় ফাটল তৈরি করতে পারে। তবে এগুলো ধীরে জ্বলতে থাকা সঙ্কট- ভেনেজুয়েলা অভিযানের মতো হঠাৎ দুর্বলতার সুযোগ নয়। শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর জোরে চার দশক ধরে ইরান নিষেধাজ্ঞা, সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের মধ্যেও নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে।
ভেনেজুয়েলা অভিযান আসলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা বেশি স্পষ্ট করে যে, অন্য দেশে একই মডেল প্রয়োগের সম্ভাবনা ভাল ফল আনবে না। ট্রাম্প এমন নেতাদের আলাদা করে তুলতে ও সরাতে পারেন, যাদের রাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ভেতর থেকে ফাঁপা, যেমন ভেনেজুয়েলা। কিন্তু তিনি ও তার জেনারেলরা ইরানের মতো জটিল রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিবর্তন করতে পারবেন না। এ ধরনের যে কোনো প্রকল্প অঞ্চলে এমন বিশৃঙ্খলা ও রক্তক্ষয় ডেকে আনবে- যা ইরাকের চেয়েও বহুগুণ বেশি দীর্ঘ ও তীব্র হবে।
(লেখক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক। তিনি ইনসাইড ইরাক নামের সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেন। তার এ লেখাটি অনলাইন আল জাজিরা থেকে অনুবাদ)














