হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন উত্তেজনা, ইরানের কড়া সতর্কবার্তা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তেজনা বেড়েছে। তেহরানের অনুমোদন ছাড়া এই নৌপথ ব্যবহার করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। একই সঙ্গে সম্প্রতি প্রস্তাবিত বিকল্প নৌপথকে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের সংঘাতের সময় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল ইরান। পরবর্তীতে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও স্থায়ী সমাধান নিয়ে আলোচনা চলাকালে কৌশলগত এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আবারও বিরোধ তৈরি হয়েছে।
ইরান জানিয়েছে, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে সামুদ্রিক সেবা বাবদ ফি আদায় করা হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এটি একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ হওয়ায় কোনো দেশ একতরফাভাবে টোল বা শুল্ক আরোপ করতে পারে না।
তেহরানের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে তারা অনড়। যদিও গত সপ্তাহে এই রুটে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, তারপরও জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
নিরাপত্তার স্বার্থে একটি আন্তর্জাতিক নৌ-তথ্য সংস্থা জাহাজগুলোকে ওমানের জলসীমা ঘেঁষে দক্ষিণের বিকল্প রুট ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে। সংস্থাটির দাবি, ওই পথটি মাইনমুক্ত এবং বর্তমানে চলাচলের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ।
শিপ-ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কিছুটা বেড়েছে। গত সপ্তাহের শেষদিকে ৯৩টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে, যা আগের সময়ের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। তবে সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন ১০০টির বেশি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করত।
মঙ্গলবার বাণিজ্যিক ও জ্বালানি বহনকারী ৩১টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। বর্তমানে ইরান, ওমান এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত বিভিন্ন রুট ব্যবহার করা হলেও অপারেটররা এখনও পরিস্থিতিকে পুরোপুরি নিরাপদ মনে করছেন না।
এরই মধ্যে গত মে মাসে ইরানের পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, সামুদ্রিক বাণিজ্যে চাপ সৃষ্টি করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছে তেহরান। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের টোল আদায়ের উদ্যোগ মেনে নেওয়া হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বিশ্লেষক হেলিমা ক্রফ্টের মতে, ইরান যদি এই জলপথের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেল পরিবহনের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
বৃহস্পতিবার আইআরজিসি পুনরায় জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পারাপারের জন্য কেবল ইরান ঘোষিত রুটই বৈধ। অন্য কোনো পথ ব্যবহার করলে তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
বর্তমানে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) এবং ওমানের সমন্বয়ে একটি অস্থায়ী ব্যবস্থার আওতায় বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার উদ্যোগ চলছে। এই ব্যবস্থায় গত তিন দিনে ৫৭টি জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তবে বিকল্প রুট ব্যবহারের পর ইরানের নতুন সতর্কবার্তায় পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
এদিকে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কীভাবে পরিচালিত হবে, তা এখনও অনিশ্চিত। মধ্যপ্রাচ্য সফরে থাকা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বাহরাইনে সাংবাদিকদের বলেন, আন্তর্জাতিক নৌপথ ব্যবহারের জন্য কোনো রাষ্ট্র একতরফাভাবে শুল্ক আরোপ করতে পারে না।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, হরমুজে ইরানের টোল আরোপের দাবিকে অঞ্চলটির কোনো দেশ সমর্থন করছে না। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতায় মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই যুক্তরাষ্ট্র এগোবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।
অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখেও দেশটির সশস্ত্র বাহিনী শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। তার দাবি, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে দ্রুত পরাজিত করার প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা সফল হয়নি।