এভারকেয়ারে খালেদা জিয়ার অবস্থা অপরিবর্তিত: দেখতে গেলেন প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে করোনারি কেয়ার ইউনিটেই (সিসিইউ) চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। গতকাল বৃটেন থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দল ঢাকায় পৌঁছে বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে এভারকেয়ার হাসপাতালে যান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল সন্ধ্যা ৭টা ৮ মিনিটে হাসপাতালে পৌঁছান তিনি। বেশ কিছু সময় সেখানে অবস্থান করে তিনি বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে খোঁজ-খবর নেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া টানা এক সপ্তাহ ধরে সিসিইউতেই আছেন। তার চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের একজন চিকিৎসক জানিয়েছেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত। আগের মতোই আছেন। এখন উন্নতি-অবনতি কোনোটাই বলা যাচ্ছে না। ফুসফুসে স্বাভাবিকভাবে বাতাস চলাচল করানোর জন্য মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন রেখে তাকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বুধবার বিকালে কিডনি কার্যক্রম সচল রাখতে ডায়ালাইসিস করা হয়েছে।
মেডিকেল বোর্ডের আরেকজন চিকিৎসক জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার অবস্থা স্থিতিশীল আছে। কিছুটা রেসপন্স করছেন। চিকিৎসক ও পরিবারের সদস্যরা ডাক দিলে কিছুটা সাড়া দেয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এটাকে আশানুরূপ উন্নতি বলা যাচ্ছে না। তার স্বাস্থ্যের বিভিন্ন প্যারামিটার উঠানামা করছে। প্রতি রাতেই বৈঠক করে বিএনপি চেয়ারপারসনের মেডিকেল বোর্ড। যেখানে দেশি-বিদেশি অন্তত দেড় ডজন চিকিৎসক যুক্ত হন। লন্ডন ক্লিনিকের বিখ্যাত চিকিৎসকরাও যুক্ত হন। ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত থাকেন ছেলে তারেক রহমান, তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান। গতকাল রাতেও খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সঙ্গে বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বৈঠক করেন।
খালেদা জিয়াকে দেখতে এভারকেয়ারে প্রধান উপদেষ্টা: গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়াকে দেখতে গতকাল এভারকেয়ার হাসপাতালে যান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সন্ধ্যা ৭টা ৮ মিনিটে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে প্রবেশ করেন। হাসপাতালের ফটকে প্রধান উপদেষ্টাকে স্বাগত জানান- বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর প্রধান উপদেষ্টাকে হাসপাতালের তৃতীয়তলায় সিসিইউতে নিয়ে যান তিনি। সেখানে বেশকিছু সময় ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন- বিএনপি চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন ও মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদার। প্রধান উপদেষ্টা কিছুক্ষণ খালেদা জিয়ার শয্যাপাশে অবস্থান করেন এবং চিকিৎসকদের কাছে তার স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নেন। প্রায় আধাঘণ্টা পর হাসপাতাল ত্যাগ করেন তিনি। এর আগে দুপুরে খালেদা জিয়াকে দেখতে এভারকেয়ার হাসপাতালে যান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এবং বিকালে যান ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীম।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধান উপদেষ্টা বেগম জিয়ার পরিবার ও দলের নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানান। এতে আরও বলা হয়, বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তার চিকিৎসক দল প্রধান উপদেষ্টাকে ব্রিফ করেন। তারা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের মাউন্ট সিনাই ও জনস হপকিন্স এবং বৃটেন ও চীনসহ বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধান ও সহায়তায় বেগম জিয়ার চিকিৎসা চলছে। এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধান উপদেষ্টা। একইসঙ্গে তিনি দেশবাসীর কাছে বেগম খালেদা জিয়ার আরোগ্য কামনায় দোয়া ও প্রার্থনার আহ্বান জানান। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
বৃটেনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রিচার্ড বিল ঢাকায়: বিএনপি চেয়ারপারসনের চিকিৎসা সহায়তায় বৃটেনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রিচার্ড বিল ঢাকায় এসেছেন। গতকাল সকাল ১০টা ২০ মিনিটে লন্ডন ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসক ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রিচার্ড বিল ঢাকায় নেমে প্রথমে একটি হোটেলে যান। তিনি দুপুরে এভারকেয়ার হাসপাতালে যান। খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় বৃটেনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের যুক্ত হওয়ার কথা আগেই জানিয়েছিলেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এজেডএম জাহিদ হোসেন। জানা গেছে, বৃটেনের চিকিৎসকরা খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সঙ্গে কাজ বৈঠক করেছেন। বর্তমানে তাকে যে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে তা অব্যাহত রাখতে তারা পরামর্শ দিয়েছে। এর বাইরে চিকিৎসার বিষয়ে তারা পরামর্শ দিচ্ছেন বলেও সূত্রটি জানিয়েছে।
গত ২৩শে নভেম্বর থেকে বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তার ফুসফুসে সংক্রামণে অবস্থার অবনতি হলে গত ২৭শে নভেম্বর থেকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে নিয়ে চিকিৎসকরা তাকে বিশেষ ব্যবস্থায় নিবিড়ভাবে চিকিৎসা দিচ্ছেন। অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞদের একটি মেডিকেল বোর্ড খালেদা জিয়ার চিকিৎসা কার্যক্রম তদারকি করছেন। ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস, কিডনির জটিলতাসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন।
এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে বিজিবি মোতায়েন: এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। খালেদা জিয়া এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গতকাল সার্বিক নিরাপত্তার জন্য বিজিবি মোতায়েন করা হয়। জানা গেছে, সার্বিক নিরাপত্তার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এক প্লাটুন হাসপাতালের গেটে দায়িত্ব পালন করছে। আরেক প্লাটুন টহলে রয়েছে।
গত সোমবার রাতে বিশেষ নিরাপত্তার জন্য ও দলীয় নেতাকর্মীদের ভিড় সামলাতে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে ব্যারিকেড বসায় পুলিশ। এর আগে খালেদা জিয়াকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা করার পর স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) নিরাপত্তা দেয়া শুরু করেছে। গত মঙ্গলবার বেলা ২টা ২০ মিনিটের দিকে এসএসএফ সদস্যরা খালেদা জিয়াকে নিরাপত্তা দেয়া শুরু করেন।























