ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষের যাত্রা নিরাপদ হোক
ঈদুল ফিতর বাংলাদেশের মানুষের জীবনে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি এক বিশাল সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা। প্রতি বছর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মৌসুমি মানবস্রোত-‘ঈদযাত্রা’। ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরও এর ব্যতিক্রম নয়; বরং সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত বলছে, এ বছরও বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজধানী ঢাকা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ফিরবেন, যা আমাদের পরিবহনব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এবারের ঈদে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ (১৫ মিলিয়ন) মানুষ ঢাকা ছেড়ে যেতে পারেন। অন্য একটি পূর্বাভাস বলছে, এই সংখ্যা ১.৫ থেকে ১.৭ কোটির বেশি হতে পারে। অর্থাৎ, কয়েক দিনের মধ্যে একটি বৃহৎ মহানগরীর জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষ স্থানান্তরিত হচ্ছে- যা পৃথিবীর যেকোনো দেশের জন্যই এক বিশাল লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ।
পরিবহন মাধ্যমভেদে এই চাপের বণ্টনও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা বলছে, ঈদযাত্রীদের প্রায় ৬০ শতাংশ সড়কপথে যাতায়াত করেন, যা প্রায় ৯০ লাখ মানুষের সমান। বাকিরা রেল, নৌ ও আকাশপথ ব্যবহার করেন। কিন্তু সমস্যা হলো- এই বিশাল যাত্রীচাপ বহনের মতো সক্ষমতা আমাদের পরিবহন অবকাঠামো এখনো পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি।
২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- সরকার এবারের ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ৭ দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে (১৭–২৩ মার্চ)। তাত্ত্বিকভাবে এই দীর্ঘ ছুটি যাত্রীচাপকে কিছুটা ছড়িয়ে দিতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অধিকাংশ মানুষই একই সময়ে যাত্রা করতে চান- বিশেষ করে ঈদের ২-৩ দিন আগে। ফলে চাপ কমার বদলে নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনে তা তীব্র আকার ধারণ করে।
এবারের ঈদযাত্রায় ঝুঁকির আরেকটি সূচক হলো- দেশজুড়ে ২০৭টি মহাসড়ক পয়েন্টকে ‘জটপ্রবণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই তথ্য আমাদের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে। একই সঙ্গে এটি নির্দেশ করে যে, সমস্যা আগেই জানা থাকলেও তা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রায়ই যথেষ্ট হয় না।
পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ শুধু সড়কেই সীমাবদ্ধ নয়। রেলপথেও চাহিদা ব্যাপক। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্যমতে, বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন হাজার হাজার আসন থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনেই স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার যাত্রী চলাচল করে, যা ঈদের সময় আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে টিকিটসংকট, অতিরিক্ত ভিড় এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে নৌপথেও চাপ কম নয়। অতীতের এক হিসাব অনুযায়ী, শুধু নৌপথেই এক ঈদে ঢাকা অঞ্চল থেকে ২০ লাখের বেশি মানুষ যাতায়াত করতে পারে। কিন্তু এই খাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা বহুবার প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- অতিরিক্ত যাত্রী ও অব্যবস্থাপনার কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে শত শত প্রাণহানির ঘটনাও রয়েছে।
পরিবহন ব্যবস্থার এই চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক আচরণগত কিছু সমস্যা। যেমন- একই দিনে যাত্রার প্রবণতা, ঝুঁকি জেনেও অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে যাতায়াত, কিংবা নিয়ম অমান্য করে দ্রুত পৌঁছানোর চেষ্টা। এসব আচরণ পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে।
এবারের ঈদযাত্রাকে প্রভাবিত করছে আরও কিছু সাম্প্রতিক বাস্তবতা। যেমন- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগেভাগে বন্ধ হওয়ায় যাত্রা কিছুটা আগে শুরু হয়েছে, ফলে যাত্রীচাপ সময়ে কিছুটা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আবার ছুটি বাড়ানোর সিদ্ধান্তও একই উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে বাস্তব ব্যবস্থাপনার ওপর।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন হলো- সমাধান কোথায়?
প্রথমত, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা অপরিহার্য। যেহেতু এখন আমাদের কাছে যাত্রীসংখ্যা, চাপের সময়, জটপ্রবণ স্থান- সবকিছুর পূর্বাভাস রয়েছে, তাই সেগুলোর ভিত্তিতে আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, চিহ্নিত ২০৭টি জটপ্রবণ এলাকায় বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিকল্প রুট চালু এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিং চালু করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, যাত্রীচাপ ব্যবস্থাপনায় ‘স্ট্যাগারিং’ বা ধাপে ধাপে যাত্রা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি-বেসরকারি অফিস, পোশাকশিল্প ও অন্যান্য খাতে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ছুটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে একই দিনে চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তৃতীয়ত, কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত ভাড়া এবং নিয়ম লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি নিতে হবে। কারণ দুর্ঘটনার বড় একটি অংশই ঘটে নিয়ম ভাঙার কারণে।
চতুর্থত, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ডিজিটাল টিকিটিং, ট্রাফিক মনিটরিং, জিপিএস-নিয়ন্ত্রিত যানবাহন ব্যবস্থাপনা- এসব উদ্যোগ যাত্রাকে আরও সুশৃঙ্খল করতে পারে।
পঞ্চমত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- সচেতনতা। রাষ্ট্র যতই উদ্যোগ নিক, যদি যাত্রীরা নিজেরা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ থেকে বিরত না হন, তবে নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা কঠিন। অতিরিক্ত ভিড়ের গাড়িতে না ওঠা, ছাদে ভ্রমণ না করা, ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলা- এসব সাধারণ আচরণই বড় দুর্ঘটনা ঠেকাতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষের এই বিশাল যাত্রা বাংলাদেশের এক অনন্য সামাজিক বাস্তবতা। এটি থামানো যাবে না, বরং এটিকে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করাই হলো চ্যালেঞ্জ। তথ্য বলছে- সমস্যা আমরা জানি, পূর্বাভাসও আমাদের হাতে আছে। এখন প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন, সমন্বিত উদ্যোগ এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ।
ঈদের আনন্দ যেন পথে হারিয়ে না যায়- এই প্রত্যাশাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক কলামিস্ট ও মানবাধিকারকর্মী























