ভাষা কি বদলাচ্ছে, নাকি বদলাচ্ছে রাজনীতি?
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে কয়েকটি শব্দ বারবার উচ্চারিত হচ্ছে- ‘আজাদি’, ‘ইনকিলাব’, ‘ইনসাফ’, ‘নয়া বন্দোবস্ত’, ‘মজলুম’, ‘জুলুম’, ‘বয়ান’। সভা-সমাবেশে, টেলিভিশনের টকশোতে, সামাজিক মাধ্যমে- এ শব্দগুলো এখন আলোচনার কেন্দ্রে। কেউ এগুলোকে নতুন রাজনৈতিক চেতনার ভাষা বলছেন, কেউ আবার মনে করছেন বাংলা ভাষার পরিসরে ইচ্ছাকৃতভাবে ভিন্ন উৎসের শব্দ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। প্রশ্ন উঠছে- ভাষা কি সত্যিই বদলে যাচ্ছে, নাকি বদলাচ্ছে রাজনীতি?
প্রথমেই বলা দরকার, আলোচনায় আসা শব্দগুলো নতুন নয়। ‘ইনকিলাব’ শব্দটি উপমহাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে বহুদিনের। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শ্লোগানটি জনতার মুখে মুখে ফিরেছে। ভারতের ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি দীর্ঘদিন ধরে এই শ্লোগান ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশেও ‘ইনকিলাব’ নামে দৈনিক পত্রিকা আছে; ‘ইত্তেফাক’ শব্দটিও আরবি-ফারসি উৎসের হলেও জাতীয় সংবাদপত্রের নাম হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। ফলে উৎসের বিচারে এগুলো বাংলা ভাষার বাইরের হলেও ব্যবহারের বিচারে দীর্ঘদিন ধরেই এ ভূখণ্ডের ভাষাজীবনের অংশ।
‘আজাদি’ মানে স্বাধীনতা, ‘ইনসাফ’ মানে সুবিচার, ‘মজলুম’ মানে নিপীড়িত, ‘জালিম’ মানে নিপীড়ক। এগুলো ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বক্তৃতায় বহু বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুন রাজনৈতিক সমাবেশ ও প্ল্যাটফর্মগুলোতে শব্দগুলোর ব্যবহার দৃশ্যত বেড়ে যায়। বিশেষ করে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ বা বিভিন্ন দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ উচ্চারণ বিতর্ককে আরও উসকে দেয়।
তাহলে কি সত্যিই ভাষা বদলাচ্ছে? নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তন ভাষার নির্দিষ্ট কিছু শব্দকে দৃশ্যমান করে তুলছে?
ভাষাবিদদের মতে, ভাষা একটি জীবন্ত সত্তা- নদীর মতো প্রবাহমান। বাংলা ভাষার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি সংস্কৃত, পালি, আরবি, ফারসি, পর্তুগিজ, ইংরেজি- বিভিন্ন ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হয়েছে। ‘আওয়ামী লীগ’, ‘কমিউনিস্ট’, ‘ইউনিয়ন’- এসব শব্দ বিদেশি উৎসের হলেও আজ আর সেগুলোকে বিদেশি মনে হয় না। ধ্বনি, রূপ ও ব্যবহারগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে শব্দগুলো বাংলা ভাষার ভেতরে আত্মীকৃত হয়েছে।
ভাষা কখনো কেবল অভিধানের নিয়মে চলে না; এটি মানুষের মুখে, ব্যবহারে, আবেগে বেঁচে থাকে। যে শব্দ মানুষের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে যায়, সেটিই টিকে থাকে। অন্যগুলো সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায়। ফলে শব্দের উৎস নয়, ব্যবহার ও গ্রহণযোগ্যতাই আসল প্রশ্ন।
তবে বিতর্কের পেছনে একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালে যে আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা কেবল ভাষার অধিকারের প্রশ্ন ছিল না; এটি ছিল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম। ফলে বাংলা ভাষা এ দেশে আবেগ ও অস্তিত্বের প্রতীক। এ বাস্তবতায় যখন আরবি-ফারসি-উর্দু উৎসের শব্দ রাজনৈতিক শ্লোগানে জোরালোভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন অনেকের মনে সাংস্কৃতিক উদ্বেগ তৈরি হয়। তাদের আশঙ্কা- এ কি ভাষার ভেতর দিয়ে পরিচয়ের পুনর্গঠন?
কিন্তু ইতিহাস বলে, ভাষাকে রাজনৈতিক ঘোষণায় বদলানো যায় না। পাকিস্তান আমলে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত জনগণের ভাষাবোধকে বদলাতে পারেনি। তেমনি আজ কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী বিশেষ শব্দ ব্যবহার করলেই বাংলা ভাষার কাঠামো পাল্টে যাবে- এমন আশঙ্কার বাস্তব ভিত্তি কম।
বরং বলা যায়, রাজনীতিই বদলাচ্ছে, আর সেই বদলের প্রতিফলন ভাষায় দেখা যাচ্ছে। প্রতিটি রাজনৈতিক যুগ নিজস্ব শব্দভাণ্ডার তৈরি করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘স্বাধীনতা’, ‘মুক্তি’, ‘বিজয়’ শব্দগুলো আবেগের কেন্দ্র ছিল। নব্বইয়ের গণআন্দোলনে ‘স্বৈরাচারবিরোধী’, ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’- এসব শব্দ ছিল উচ্চারিত। এখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘ইনসাফ’, ‘আজাদি’, ‘নয়া বন্দোবস্ত’- এসব শব্দ হয়তো নতুন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিচয়ের রাজনীতি। কোনো গোষ্ঠী বা আন্দোলন যখন নিজেদের আলাদা চিহ্নিত করতে চায়, তখন তারা ভাষার ভেতরেও আলাদা স্বর তৈরি করে। নির্দিষ্ট শব্দের পুনরাবৃত্তি সেই স্বরকে জোরালো করে। ফলে শব্দ হয়ে ওঠে রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ। এ প্রক্রিয়া বিশ্বজুড়েই দেখা যায়। আমেরিকার নাগরিক অধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের গণঅভ্যুত্থান- প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিশেষ শব্দ ও শ্লোগান আন্দোলনের পরিচয় বহন করেছে।
বাংলাদেশেও সামাজিক মাধ্যম এ প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করেছে। প্রভাবশালী নেতারা যখন নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করেন, অনুসারীরাও তা গ্রহণ করেন। অল্প সময়ের মধ্যে শব্দগুলো ট্রেন্ডে পরিণত হয়। এতে মনে হতে পারে ভাষায় বড় পরিবর্তন ঘটছে। বাস্তবে এটি ভাষার স্বাভাবিক অভিযোজন ও বিস্তারের অংশ।
তবে সতর্ক থাকার জায়গা আছে। ভাষা যদি বিভাজনের দেয়াল হয়ে ওঠে, তবে তা সামাজিক সংহতির জন্য ক্ষতিকর। যদি ‘ইনকিলাব’ বলা মানে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়, আর ‘বিপ্লব’ বলা মানে আরেকটি পরিচয়- এমন বিভাজন তৈরি হয়, তাহলে ভাষা সেতুর বদলে দেয়ালে পরিণত হবে। ভাষাকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণকর নয়।
আসলে বাংলা ভাষার জন্য প্রকৃত চ্যালেঞ্জ অন্যত্র। বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির যুগে ইংরেজির প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা- এসব ক্ষেত্রে বাংলা এখনো পূর্ণাঙ্গ কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারেনি। ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থাকলে সেটি এ জায়গায় হওয়া উচিত। রাজনৈতিক শ্লোগানে ‘ইনকিলাব’ উচ্চারিত হলো কি ‘বিপ্লব’- সে বিতর্কের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলা কি জ্ঞানচর্চার শক্তিশালী ভাষা হয়ে উঠছে?
ভাষা কখনো শূন্যে পরিবর্তিত হয় না; এটি সমাজ-রাজনীতির সঙ্গেই পরিবর্তিত হয়। তাই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়- ভাষা যেমন সামান্য বদলায়, তেমনি রাজনীতিও বদলায়। তবে বর্তমান বিতর্কে পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু ভাষা নয়; বরং রাজনীতির নতুন বাস্তবতা। নতুন শক্তির উত্থান, নতুন আকাঙ্ক্ষা, নতুন প্রতীক- এসব মিলেই কিছু শব্দকে সামনে এনে দিয়েছে।
সময়ের সঙ্গে দেখা যাবে কোন শব্দ টিকে থাকবে, কোনটি হারিয়ে যাবে। বাংলা ভাষার ইতিহাস আমাদের আশ্বস্ত করে- এ ভাষা গ্রহণ করতে জানে, আত্মীকরণ করতে জানে, প্রয়োজনে বর্জনও করতে জানে। তাই আতঙ্কের চেয়ে প্রয়োজন সংলাপ ও সহনশীলতা। শব্দের উৎস নয়, তার অর্থ ও মানবিক আবেদনই হওয়া উচিত বিবেচনার মানদণ্ড।
ভাষা বদলাচ্ছে কি না- এই প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি ভাষাকে বিভাজনের অস্ত্র বানাচ্ছি? যদি ভাষাকে রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রতীক বানিয়ে ফেলি, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভাষার স্বাভাবিক সৌন্দর্য। আর যদি ভাষার বহুত্বকে স্বীকার করি, তবে সেটিই হবে বাংলা ভাষার ঐতিহ্যের প্রতি সত্যিকারের সম্মান।
শেষ পর্যন্ত ভাষা মানুষের। রাজনীতি আসে যায়, শ্লোগান বদলায়, কিন্তু মানুষের মুখে যে শব্দ বেঁচে থাকে, সেটিই ভাষার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। তাই হয়তো বলা যায়- ভাষা তার নিজস্ব ছন্দেই চলবে; বদলাচ্ছে মূলত রাজনীতির পরিসর, আর সেই বদলের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে শব্দের ভেতর।
ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক













