ঢাকা ০৪:৫৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ১৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo বুথফেরত সমীক্ষা ‘টাকা দিয়ে করানো’, দাবি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। Logo সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় করা দুই মামলায় সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামিন। Logo রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ ও গ্রেপ্তার করার দাবি নাহিদ ইসলামের Logo শত্রুপক্ষ ‘হার্ট অ্যাটাক’ করবে, নতুন অস্ত্র নিয়ে ইরানের বার্তা Logo ঢাকা জেলার প্রথম নারী পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন শামীমা পারভীন শিল্পি Logo হরমুজে অবরোধ, পারস্য উপসাগরে আটকা ২০ হাজার নাবিক Logo চন্দ্রগঞ্জে যুবদলের কর্মী সভা অনুষ্ঠিত Logo উগান্ডায় অবৈধ অভিবাসন বিরোধী অভিযান: বাংলাদেশিসহ ২৩১ বিদেশি আটক Logo যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সংসদে আনার দাবি রুমিন ফারহানার Logo বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪ উড়োজাহাজ ক্রয়ে চুক্তি করতে যাচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস

কফিনে মোড়ানো স্বপ্ন: সুদানে শহীদ ৬ শান্তিরক্ষীর অশ্রুসিক্ত জানাজা

নিজস্ব সংবাদ :

সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের একটি ঘাঁটিতে সংঘটিত বর্বরোচিত সন্ত্রাসী ড্রোন হামলায় শহীদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৬ সদস্যকে গতকাল অশ্রুসিক্ত বিদায় জানানো হয়েছে। সকাল ৯টায় ঢাকা সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মসজিদে তাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল
হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এবং সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানাজায় অংশ নেন। এসময় স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ।

গতকাল ঢাকা সেনানিবাসে জানাজা শেষে শহীদ শান্তিরক্ষী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক শামীম রেজার (বীর) বাবা অর্ধেক জাতীয় পতাকা আর অর্ধেক জাতিসংঘের পতাকায় মোড়ানো ছেলের কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, আমার ছেলে ছিল আমার বটগাছ। সেই গাছটা আর নেই। আমার সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। অশ্রুসিক্ত হয়ে তিনি বলেন, আমার ছেলে অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়েছিল। ছোট ভাইকে বলেছিল ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে, আর ছোট বোনকে কথা দিয়েছিল ফেরার সময় বিয়ের হার নিয়ে আসবে। কিন্তু সে নিজেই কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরলো। এসময় করপোরাল মোহাম্মদ মাসুদ রানার ছোট ভাই সৈনিক রনি তার ভাইয়ের জন্য সবার কাছে দোয়া ও ক্ষমা চান। তিনি বলেন, আমার ভাই মাসুদ রানা ১৯ বছর ধরে সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছেন। তার আট বছরের একটি মেয়ে আছে। তার জন্য সকলে দোয়া করবেন। সৈনিক মোহাম্মদ মমিনুল ইসলামের (বীর) ভগ্নিপতি মিজানুর রহমান বলেন, শহীদ মমিনুল স্ত্রী ও দুই সন্তান রেখে গেছেন। তাদের একজনের বয়স দুই বছর ও আরেক জনের বয়স ১২ বছর। এ ছাড়াও তার ছোট ভাই ও বোন রয়েছে। আপনারা সকলে আমাদের জন্য দোয়া করবেন। সৈনিক শান্ত (বীর) মণ্ডলের চাচা আবু তাহের মণ্ডল বলেন, স্কুল শেষ করেই শান্ত সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তার বাবা নুরুল ইসলাম মণ্ডলও সেনাবাহিনীতে ছিলেন। নুরুল ইসলাম বেঁচে থাকলে আজ তিনি গর্ববোধ করতেন যে, তার ছেলে শহীদ হয়েছে, জীবন উৎসর্গ করেছে। তিনি বলেন, শান্ত’র পরিবার অত্যন্ত গরিব। তার মা দুই ছেলের ওপর নির্ভর করেই সংসার চালাতেন। তিনি শান্ত’র প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা দ্রুত পরিবারকে দেয়ার অনুরোধ জানান। শহীদ মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের ভগ্নিপতি মো. ওয়ালিউল্লাহ বলেন, জাহাঙ্গীর স্ত্রী ও তিন বছরের এক ছেলেকে রেখে গেছেন। সাত বছর আগে তাদের বিয়ে হয়েছিল। তিনি জাহাঙ্গীরের ভুলত্রুটির জন্য সবার কাছে ক্ষমা চান। লন্ড্রি কর্মী শহীদ মোহাম্মদ সবুজ মিয়ার চাচা আব্দুল হামিদ বলেন, সবুজ সমপ্রতি বিয়ে করেছিলেন। তিনি স্ত্রী ও বৃদ্ধা মাকে রেখে গেছেন। তিনি সবার কাছে সবুজের জন্য দোয়া চান।

জানাজার আগে নিহত ছয় শান্তিরক্ষীর সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করা হয় এবং তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। এরপর সামরিক রীতি অনুযায়ী তাদের রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়। জাতিসংঘ মহাসচিবের পক্ষে ইউনিসফা’র চিফ কমিউনিটি লিয়াজোঁ অফিসার মি. বরিস-এফ্রেম চৌমাভি বাংলাদেশ সরকার, সেনাবাহিনী ও নিহতদের পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি নিহতদের ‘শান্তির সৈনিক’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তারা অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়েও পেশাদারিত্ব, সততা ও সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। এসময় শহীদ শান্তিরক্ষীদের স্বজনদের কাছে জাতিসংঘ মহাসচিবের পক্ষ থেকে তিনি জাতিসংঘের পতাকা হস্তান্তর করেন। অন্যান্যের মধ্যে এ সময়  প্রধান উপদেষ্টার পক্ষে তার সামরিক সচিব পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। একই সঙ্গে শহীদ পরিবারের কাছে প্রধান উপদেষ্টার স্বাক্ষরিত পৃথক পৃথক শোকবার্তা হস্তান্তর করেন। পরে হেলিকপ্টারে করে শহীদদের মরদেহ নাটোর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রাজবাড়ী ও কিশোরগঞ্জে তাদের নিজ নিজ বাড়িতে পাঠানো হয়। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হবে। তাদের মরদেহ দেশে আনার আগেও আবিয়েতে তাদের জানাজা ও সামরিক সম্মান জানানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১৩ই ডিসেম্বর সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের একটি ঘাঁটিতে সংঘটিত বর্বরোচিত সন্ত্রাসী ড্রোন হামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৬ সদস্য শহীদ হন। ওই ঘটনায় আরও ৯ জন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষী আহত হয়েছেন।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০১:১৮:০৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫
৪৬০০ বার পড়া হয়েছে

ধানের শীষে ভোট দিন

কফিনে মোড়ানো স্বপ্ন: সুদানে শহীদ ৬ শান্তিরক্ষীর অশ্রুসিক্ত জানাজা

আপডেট সময় ০১:১৮:০৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫

সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের একটি ঘাঁটিতে সংঘটিত বর্বরোচিত সন্ত্রাসী ড্রোন হামলায় শহীদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৬ সদস্যকে গতকাল অশ্রুসিক্ত বিদায় জানানো হয়েছে। সকাল ৯টায় ঢাকা সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মসজিদে তাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল
হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এবং সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানাজায় অংশ নেন। এসময় স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ।

গতকাল ঢাকা সেনানিবাসে জানাজা শেষে শহীদ শান্তিরক্ষী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক শামীম রেজার (বীর) বাবা অর্ধেক জাতীয় পতাকা আর অর্ধেক জাতিসংঘের পতাকায় মোড়ানো ছেলের কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, আমার ছেলে ছিল আমার বটগাছ। সেই গাছটা আর নেই। আমার সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। অশ্রুসিক্ত হয়ে তিনি বলেন, আমার ছেলে অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়েছিল। ছোট ভাইকে বলেছিল ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে, আর ছোট বোনকে কথা দিয়েছিল ফেরার সময় বিয়ের হার নিয়ে আসবে। কিন্তু সে নিজেই কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরলো। এসময় করপোরাল মোহাম্মদ মাসুদ রানার ছোট ভাই সৈনিক রনি তার ভাইয়ের জন্য সবার কাছে দোয়া ও ক্ষমা চান। তিনি বলেন, আমার ভাই মাসুদ রানা ১৯ বছর ধরে সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছেন। তার আট বছরের একটি মেয়ে আছে। তার জন্য সকলে দোয়া করবেন। সৈনিক মোহাম্মদ মমিনুল ইসলামের (বীর) ভগ্নিপতি মিজানুর রহমান বলেন, শহীদ মমিনুল স্ত্রী ও দুই সন্তান রেখে গেছেন। তাদের একজনের বয়স দুই বছর ও আরেক জনের বয়স ১২ বছর। এ ছাড়াও তার ছোট ভাই ও বোন রয়েছে। আপনারা সকলে আমাদের জন্য দোয়া করবেন। সৈনিক শান্ত (বীর) মণ্ডলের চাচা আবু তাহের মণ্ডল বলেন, স্কুল শেষ করেই শান্ত সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তার বাবা নুরুল ইসলাম মণ্ডলও সেনাবাহিনীতে ছিলেন। নুরুল ইসলাম বেঁচে থাকলে আজ তিনি গর্ববোধ করতেন যে, তার ছেলে শহীদ হয়েছে, জীবন উৎসর্গ করেছে। তিনি বলেন, শান্ত’র পরিবার অত্যন্ত গরিব। তার মা দুই ছেলের ওপর নির্ভর করেই সংসার চালাতেন। তিনি শান্ত’র প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা দ্রুত পরিবারকে দেয়ার অনুরোধ জানান। শহীদ মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের ভগ্নিপতি মো. ওয়ালিউল্লাহ বলেন, জাহাঙ্গীর স্ত্রী ও তিন বছরের এক ছেলেকে রেখে গেছেন। সাত বছর আগে তাদের বিয়ে হয়েছিল। তিনি জাহাঙ্গীরের ভুলত্রুটির জন্য সবার কাছে ক্ষমা চান। লন্ড্রি কর্মী শহীদ মোহাম্মদ সবুজ মিয়ার চাচা আব্দুল হামিদ বলেন, সবুজ সমপ্রতি বিয়ে করেছিলেন। তিনি স্ত্রী ও বৃদ্ধা মাকে রেখে গেছেন। তিনি সবার কাছে সবুজের জন্য দোয়া চান।

জানাজার আগে নিহত ছয় শান্তিরক্ষীর সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করা হয় এবং তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। এরপর সামরিক রীতি অনুযায়ী তাদের রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়। জাতিসংঘ মহাসচিবের পক্ষে ইউনিসফা’র চিফ কমিউনিটি লিয়াজোঁ অফিসার মি. বরিস-এফ্রেম চৌমাভি বাংলাদেশ সরকার, সেনাবাহিনী ও নিহতদের পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি নিহতদের ‘শান্তির সৈনিক’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তারা অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়েও পেশাদারিত্ব, সততা ও সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। এসময় শহীদ শান্তিরক্ষীদের স্বজনদের কাছে জাতিসংঘ মহাসচিবের পক্ষ থেকে তিনি জাতিসংঘের পতাকা হস্তান্তর করেন। অন্যান্যের মধ্যে এ সময়  প্রধান উপদেষ্টার পক্ষে তার সামরিক সচিব পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। একই সঙ্গে শহীদ পরিবারের কাছে প্রধান উপদেষ্টার স্বাক্ষরিত পৃথক পৃথক শোকবার্তা হস্তান্তর করেন। পরে হেলিকপ্টারে করে শহীদদের মরদেহ নাটোর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রাজবাড়ী ও কিশোরগঞ্জে তাদের নিজ নিজ বাড়িতে পাঠানো হয়। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হবে। তাদের মরদেহ দেশে আনার আগেও আবিয়েতে তাদের জানাজা ও সামরিক সম্মান জানানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১৩ই ডিসেম্বর সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের একটি ঘাঁটিতে সংঘটিত বর্বরোচিত সন্ত্রাসী ড্রোন হামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৬ সদস্য শহীদ হন। ওই ঘটনায় আরও ৯ জন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষী আহত হয়েছেন।