সমুদ্রের ২৬ ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান: আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করল সরকার
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ২৪ মে, ২০২৬
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর দেশের সমুদ্রসীমায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে সরকার। ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬’ নামের এই নতুন উদ্যোগের আওতায় গভীর ও অগভীর সমুদ্রের মোট ২৬টি ব্লক বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে। সরকারের আশা, এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।
আজ রোববার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
বিনিয়োগকারীদের আস্থার বড় জায়গা নির্বাচিত সরকার: জ্বালানি মন্ত্রী
সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “আমরা একটি নির্বাচিত সরকার। আমাদের নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়েই আমরা সরকার গঠন করেছি। এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় আস্থার জায়গা।”
তিনি জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ১০০ দিনের মধ্যে অফশোর বিডিং রাউন্ড আহ্বানের লক্ষ্যেই ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি)-২০২৬’ চূড়ান্ত করা হয়েছে।
অতীতের সফলতার প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, ১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উদ্যোগে দেশের প্রথম সফল বিডিং রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সময়ের চুক্তির ফলেই বিবিয়ানা ও সাঙ্গুর মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়, যা বর্তমানে দেশের মোট উৎপাদিত গ্যাসের একটা বড় অংশ সরবরাহ করছে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশের মোট গ্যাসের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে শেভরন পরিচালিত ক্ষেত্রগুলো থেকে।
আকর্ষনীয় শর্ত ও নতুন মডেল পিএসসি
গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, প্রতিটি প্রকল্পে ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। অনুসন্ধানে গ্যাস বা তেল পাওয়া না গেলে সরকার কোনো অর্থ ফেরত দেবে না। তাই ঝুঁকি বিবেচনা করে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে পিএসসির শর্তে বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন পিএসসির প্রধান সুবিধাসমূহ:
-
১০০ শতাংশ কস্ট রিকভারি (ব্যয় তুলে নেওয়ার) সুবিধা।
-
আন্তর্জাতিক বাজারের ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্যের সঙ্গে গ্যাসের দাম সমন্বয়।
-
ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের (কন্ট্রাক্টর) আয়কর পেট্রোবাংলা কর্তৃক বহন।
-
আমদানিকৃত যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামে শুল্কমুক্ত সুবিধা।
-
নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে গ্যাস রপ্তানির সুযোগ।
-
গভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে দুটি সংলগ্ন ব্লকের জন্য একক চুক্তির সুবিধা।
২৬ ব্লকে বিডিংয়ের সময়সীমা
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দরপত্রের জন্য উন্মুক্ত করা ২৬টি ব্লকের মধ্যে ১১টি অগভীর সমুদ্রে এবং ১৫টি গভীর সমুদ্রে অবস্থিত। আগ্রহী আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো এককভাবে কিংবা কনসোর্টিয়াম (যৌথ উদ্যোগ) গঠন করে এতে অংশ নিতে পারবে। দরপত্র বা বিড জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী ৩০ নভেম্বর, ২০২৬।
মন্ত্রী জানান, ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক কোম্পানি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে আগ্রহ দেখিয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে বলেও তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
বাপেক্সের সক্ষমতা ও আক্ষেপ
সমুদ্রসীমা জয়ের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত গতিতে অনুসন্ধান না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করেন জ্বালানি মন্ত্রী। তিনি বলেন, “প্রতিবেশী দেশগুলো একই সমুদ্র এলাকা থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে, অথচ আমরা এখনো জানি না আমাদের সমুদ্রের নিচে ঠিক কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে।” দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে শক্তিশালী করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গভীর সমুদ্রে কাজ করার মতো প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা আপতত বাপেক্সের না থাকায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কাজের সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে আমাদের কর্মীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালার সুখবর
সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, সরকার সমুদ্র ও স্থলভাগ উভয় অঞ্চলেই জ্বালানি অনুসন্ধান বৃদ্ধির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দিচ্ছে। আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে নতুন ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা’ অনুমোদিত হতে পারে।
তিনি আরও জানান, ‘অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬’ সফল করতে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম, ওয়েবসাইট এবং বিদেশের বাংলাদেশ মিশনগুলোর মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ১৯৯৩ সালের মতোই এবারের বিডিং রাউন্ডও সফল হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম এবং পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।





















