ঢাকা ১০:৪২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চালু হবে ইলেকট্রিক ট্রেন Logo কক্সবাজারে ৫৪ হাজার ইয়াবাসহ এপিবিএন সদস্য গ্রেপ্তার Logo চাঁদপুরে তিন বিচারকের আদালত বর্জনের ঘোষণা আইনজীবীদের Logo জ্বালানিমন্ত্রীর সিরাজগঞ্জের বাড়িতে বজ্রপাতে আগুন Logo ৮০-৯০-এর দশকের নস্টালজিয়া: অতীত কি সত্যিই এতটা সোনালি ছিল? Logo মেট্রোরেলের ২৭ বিয়ারিং প্যাড অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ Logo মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের জেরে ফের ১০০ ডলারের কাছাকাছি তেলের দাম Logo সরকারি দাপ্তরিক যোগাযোগে ‘মহামান্য’ ও ‘মাননীয়’ ব্যবহার নিষিদ্ধ Logo নিকাহ রেজিষ্ট্রার বিষয়ে একাধিক রিট, রিটকারী ও আইনজীবীকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা Logo আগামী অর্থবছরের মধ্যে ৮ বিভাগে ক্যানসার হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ সেবা: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

৮০-৯০-এর দশকের নস্টালজিয়া: অতীত কি সত্যিই এতটা সোনালি ছিল?

নিজস্ব প্রতিবেদক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন ঝড় তুলেছে ৮০ ও ৯০-এর দশকের নস্টালজিয়া। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে অনেকেই নিজেদের বর্তমান সময়ের ছবিকে ওই দুই দশকের অবয়বে রূপ দিচ্ছেন। একই সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া সেই সময়ের জন্য আক্ষেপ করছেন এবং বর্তমান সময়কে নানা সমালোচনায় বিদ্ধ করছেন।

এআইয়ের ছোঁয়া হয়তো নতুন, কিন্তু এই অনুভূতি মোটেও নতুন নয়। মাঝেমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে ওঠে ৮০ ও ৯০-এর দশকের স্মৃতিচারণে। অনেকেই জোর দিয়ে বলেন, তখন জীবন অনেক ভালো ছিল। এমনকি বর্তমান প্রজন্ম কোনো না কোনোভাবে ‘রসাতলে গেছে’ বলেও মন্তব্য করেন।

কিন্তু জেন-জি প্রজন্মের একজন সদস্য হিসেবে অতীতকে এমন রঙিন চশমায় দেখার বিষয়টি বেশ অবিশ্বাস্য মনে হয়।

নস্টালজিয়া অবশ্যই খারাপ কিছু নয়। এটি মানুষের সবচেয়ে স্বাভাবিক অনুভূতিগুলোর একটি। আমরা সবাই জীবনের কিছু সময়, বিশেষ করে শৈশব ও কৈশোরকে রোমান্টিকভাবে স্মরণ করি। তবে আমরা একসময় কোনো এক সাংস্কৃতিক স্বর্ণযুগে বাস করতাম এবং এরপর হঠাৎ করেই সবকিছু অধঃপতনের দিকে গেল—এমন ধারণা অনেক বেশি সরলীকৃত।

কারণ বর্তমান প্রজন্ম শূন্য থেকে আসেনি। ২০২৬ সালের এই পৃথিবী একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। ৮০-এর দশক ৯০-এর দশককে প্রভাবিত করেছে, ৯০-এর দশক গড়ে দিয়েছে ২০০০-এর দশককে এবং ২০০০-এর দশক তৈরি করেছে ২০১০-এর দশকের বাস্তবতা। বিভিন্ন দশকের ধারাবাহিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই আজকের সমাজ তৈরি হয়েছে।

এখানে তাই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে—এখন আসলে দেশ চালাচ্ছেন কারা?

কথিত সেই গৌরবময় ৮০ ও ৯০-এর দশকে বেড়ে ওঠা মানুষগুলোর অনেকেই আজকের নীতিনির্ধারক, আমলা, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক নেতা। যে প্রতিষ্ঠান ও সমাজ নিয়ে আজ অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলো গড়ে তুলতে তাঁরাও বছরের পর বছর ভূমিকা রেখেছেন।

তাহলে কথিত সেই চমৎকার সময়ে বেড়ে ওঠা মানুষগুলো যদি সত্যিই এত অসাধারণ হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁরা কী ধরনের সমাজ তৈরি করেছেন? প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষ কোথায়? নাগরিক সংস্কৃতি কোথায়? জবাবদিহি, জননৈতিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যই বা কোথায়?

তরুণ প্রজন্মকে সাংস্কৃতিকভাবে নিকৃষ্ট বলে সমালোচনা করা যায় না, অথচ একই সঙ্গে অস্বীকার করা যায় না যে, এই প্রজন্ম যে সমাজে বেড়ে উঠেছে, সেটি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আগের প্রজন্মেরও বড় ভূমিকা রয়েছে।

অতীতকে আমরা যেভাবে মনে রাখি, সেখানেও রয়েছে আরেকটি সমস্যা।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন নিয়ে যথেষ্ট গভীর ও কঠোর একাডেমিক গবেষণা হয়নি। অন্তত ২০১০-এর দশক পর্যন্ত জনপরিসর অনেকটাই নগরভিত্তিক অভিজাত শ্রেণি ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল।

ফলে ‘সমাজ’ বলতে আমরা যা দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম, তা অনেক সময় সমাজের সেই অংশটুকুই ছিল, যেটিকে ওই প্রভাবশালী মহল জনসমক্ষে আসার যোগ্য মনে করত।

যেসব বিষয়কে এখন ‘অশ্লীল’, ‘রুচিহীন’ বা ‘অপসংস্কৃতি’ বলা হয়, সেগুলো কিন্তু আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সৃষ্টি করেনি। এগুলো জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বরাবরই ছিল। শুধু মূলধারায় তাদের প্রবেশাধিকার ছিল সীমিত।

এ ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদ ও কাসেম বিন আবু বকরের উদাহরণ সামনে আনা যায়।

হুমায়ূন আহমেদ বিপুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, কারণ তিনি মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক রুচির একটি পরিশীলিত ও সহজবোধ্য রূপ তুলে ধরেছিলেন। টেলিভিশন ও সাহিত্যের মাধ্যমে তিনি সফলভাবে মূলধারায় প্রবেশ করেছিলেন।

অন্যদিকে কাসেম বিন আবু বকরের বইও একসময় বিপুল জনপ্রিয় ছিল। তবে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের প্রভাবশালী মহল তাঁকে একই ধরনের মূলধারার মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য মনে করেনি। তাঁর পাঠকপ্রিয়তা অবশ্য তাতে কমেনি। ঢাকাকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক অভিজাতরা শুধু সেই জনপ্রিয়তার বড় অংশ দেখতে পাননি।

সাংস্কৃতিক অভিজাতদের চোখে কোনো কিছু অদৃশ্য থাকার অর্থ এই নয় যে, তার অস্তিত্ব ছিল না।

প্রযুক্তির বিকাশ এখন সেই সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের বড় একটি অংশ ভেঙে দিয়েছে। প্রায় সবার হাতেই স্মার্টফোন এবং ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে প্রবেশাধিকার রয়েছে। ফলে যারা একসময় মূলধারার গণমাধ্যম, প্রকাশক বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ছাড়া জনপরিসরে দৃশ্যমান হওয়ার সুযোগ পেতেন না, তাঁরাই এখন নিজস্ব দর্শক-শ্রোতা তৈরি করতে পারছেন।

এভাবেই হিরো আলম, প্রিন্স মামুনসহ অগণিত মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে।

তাঁরা আর আড়ালে নেই। কখনো কখনো তাঁরা এতটাই বর্ণময়, বিতর্কিত ও সাংস্কৃতিকভাবে সর্বব্যাপী হয়ে ওঠেন যে, জনসাধারণের মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য কী—একসময় যারা তা নির্ধারণ করতেন, সেই অভিজাতদেরও তাঁরা ছাপিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত মূলধারার গণমাধ্যমকেও তাঁদের উপস্থিতি স্বীকার করতে হয়।

আর তখন মধ্যবিত্তের ‘সুরুচি’র রক্ষকেরা আক্ষেপ করেন, সমাজে ‘নান্দনিক রুচির দুর্ভিক্ষ’ চলছে।

কিন্তু হয়তো সমাজ হঠাৎ করে রসাতলে যাচ্ছে না। হয়তো যা সব সময়ই ছিল, প্রযুক্তির বদৌলতে আমরা এখন শুধু তার আরও বেশি কিছু দেখতে পাচ্ছি।

তাই ৮০ ও ৯০-এর দশকের নস্টালজিয়ার মূল সমস্যা হতে পারে আমাদের স্মৃতির বাছাই। আমরা সেই অংশগুলোই মনে রাখি, যা আমাদের ভালো অনুভব করায়। অথচ যেসব বিষয় বর্তমানকে কেন এমন দেখাচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে, সেগুলো ভুলে যাই।

কথিত সেই গৌরবময় দশকগুলোতে বেড়ে ওঠা মানুষগুলো যদি এখন দেশ ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকেন, তাহলে তাঁদের নিজেদের কাছেই একটি সহজ প্রশ্ন রাখা যায়—আপনাদের বেড়ে ওঠার সময়টা যদি সত্যিই এত অসাধারণ হয়ে থাকে, তাহলে আপনারা যে সমাজ গড়ে তুলেছেন এবং এখনো যেভাবে গড়ে চলেছেন, তার অবস্থা এতটা হতাশাজনক কেন?

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৮:২৯:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৪৫০৫ বার পড়া হয়েছে

৮০-৯০-এর দশকের নস্টালজিয়া: অতীত কি সত্যিই এতটা সোনালি ছিল?

আপডেট সময় ০৮:২৯:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন ঝড় তুলেছে ৮০ ও ৯০-এর দশকের নস্টালজিয়া। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে অনেকেই নিজেদের বর্তমান সময়ের ছবিকে ওই দুই দশকের অবয়বে রূপ দিচ্ছেন। একই সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া সেই সময়ের জন্য আক্ষেপ করছেন এবং বর্তমান সময়কে নানা সমালোচনায় বিদ্ধ করছেন।

এআইয়ের ছোঁয়া হয়তো নতুন, কিন্তু এই অনুভূতি মোটেও নতুন নয়। মাঝেমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে ওঠে ৮০ ও ৯০-এর দশকের স্মৃতিচারণে। অনেকেই জোর দিয়ে বলেন, তখন জীবন অনেক ভালো ছিল। এমনকি বর্তমান প্রজন্ম কোনো না কোনোভাবে ‘রসাতলে গেছে’ বলেও মন্তব্য করেন।

কিন্তু জেন-জি প্রজন্মের একজন সদস্য হিসেবে অতীতকে এমন রঙিন চশমায় দেখার বিষয়টি বেশ অবিশ্বাস্য মনে হয়।

নস্টালজিয়া অবশ্যই খারাপ কিছু নয়। এটি মানুষের সবচেয়ে স্বাভাবিক অনুভূতিগুলোর একটি। আমরা সবাই জীবনের কিছু সময়, বিশেষ করে শৈশব ও কৈশোরকে রোমান্টিকভাবে স্মরণ করি। তবে আমরা একসময় কোনো এক সাংস্কৃতিক স্বর্ণযুগে বাস করতাম এবং এরপর হঠাৎ করেই সবকিছু অধঃপতনের দিকে গেল—এমন ধারণা অনেক বেশি সরলীকৃত।

কারণ বর্তমান প্রজন্ম শূন্য থেকে আসেনি। ২০২৬ সালের এই পৃথিবী একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। ৮০-এর দশক ৯০-এর দশককে প্রভাবিত করেছে, ৯০-এর দশক গড়ে দিয়েছে ২০০০-এর দশককে এবং ২০০০-এর দশক তৈরি করেছে ২০১০-এর দশকের বাস্তবতা। বিভিন্ন দশকের ধারাবাহিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই আজকের সমাজ তৈরি হয়েছে।

এখানে তাই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে—এখন আসলে দেশ চালাচ্ছেন কারা?

কথিত সেই গৌরবময় ৮০ ও ৯০-এর দশকে বেড়ে ওঠা মানুষগুলোর অনেকেই আজকের নীতিনির্ধারক, আমলা, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক নেতা। যে প্রতিষ্ঠান ও সমাজ নিয়ে আজ অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলো গড়ে তুলতে তাঁরাও বছরের পর বছর ভূমিকা রেখেছেন।

তাহলে কথিত সেই চমৎকার সময়ে বেড়ে ওঠা মানুষগুলো যদি সত্যিই এত অসাধারণ হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁরা কী ধরনের সমাজ তৈরি করেছেন? প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষ কোথায়? নাগরিক সংস্কৃতি কোথায়? জবাবদিহি, জননৈতিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যই বা কোথায়?

তরুণ প্রজন্মকে সাংস্কৃতিকভাবে নিকৃষ্ট বলে সমালোচনা করা যায় না, অথচ একই সঙ্গে অস্বীকার করা যায় না যে, এই প্রজন্ম যে সমাজে বেড়ে উঠেছে, সেটি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আগের প্রজন্মেরও বড় ভূমিকা রয়েছে।

অতীতকে আমরা যেভাবে মনে রাখি, সেখানেও রয়েছে আরেকটি সমস্যা।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন নিয়ে যথেষ্ট গভীর ও কঠোর একাডেমিক গবেষণা হয়নি। অন্তত ২০১০-এর দশক পর্যন্ত জনপরিসর অনেকটাই নগরভিত্তিক অভিজাত শ্রেণি ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল।

ফলে ‘সমাজ’ বলতে আমরা যা দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম, তা অনেক সময় সমাজের সেই অংশটুকুই ছিল, যেটিকে ওই প্রভাবশালী মহল জনসমক্ষে আসার যোগ্য মনে করত।

যেসব বিষয়কে এখন ‘অশ্লীল’, ‘রুচিহীন’ বা ‘অপসংস্কৃতি’ বলা হয়, সেগুলো কিন্তু আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সৃষ্টি করেনি। এগুলো জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বরাবরই ছিল। শুধু মূলধারায় তাদের প্রবেশাধিকার ছিল সীমিত।

এ ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদ ও কাসেম বিন আবু বকরের উদাহরণ সামনে আনা যায়।

হুমায়ূন আহমেদ বিপুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, কারণ তিনি মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক রুচির একটি পরিশীলিত ও সহজবোধ্য রূপ তুলে ধরেছিলেন। টেলিভিশন ও সাহিত্যের মাধ্যমে তিনি সফলভাবে মূলধারায় প্রবেশ করেছিলেন।

অন্যদিকে কাসেম বিন আবু বকরের বইও একসময় বিপুল জনপ্রিয় ছিল। তবে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের প্রভাবশালী মহল তাঁকে একই ধরনের মূলধারার মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য মনে করেনি। তাঁর পাঠকপ্রিয়তা অবশ্য তাতে কমেনি। ঢাকাকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক অভিজাতরা শুধু সেই জনপ্রিয়তার বড় অংশ দেখতে পাননি।

সাংস্কৃতিক অভিজাতদের চোখে কোনো কিছু অদৃশ্য থাকার অর্থ এই নয় যে, তার অস্তিত্ব ছিল না।

প্রযুক্তির বিকাশ এখন সেই সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের বড় একটি অংশ ভেঙে দিয়েছে। প্রায় সবার হাতেই স্মার্টফোন এবং ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে প্রবেশাধিকার রয়েছে। ফলে যারা একসময় মূলধারার গণমাধ্যম, প্রকাশক বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ছাড়া জনপরিসরে দৃশ্যমান হওয়ার সুযোগ পেতেন না, তাঁরাই এখন নিজস্ব দর্শক-শ্রোতা তৈরি করতে পারছেন।

এভাবেই হিরো আলম, প্রিন্স মামুনসহ অগণিত মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে।

তাঁরা আর আড়ালে নেই। কখনো কখনো তাঁরা এতটাই বর্ণময়, বিতর্কিত ও সাংস্কৃতিকভাবে সর্বব্যাপী হয়ে ওঠেন যে, জনসাধারণের মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য কী—একসময় যারা তা নির্ধারণ করতেন, সেই অভিজাতদেরও তাঁরা ছাপিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত মূলধারার গণমাধ্যমকেও তাঁদের উপস্থিতি স্বীকার করতে হয়।

আর তখন মধ্যবিত্তের ‘সুরুচি’র রক্ষকেরা আক্ষেপ করেন, সমাজে ‘নান্দনিক রুচির দুর্ভিক্ষ’ চলছে।

কিন্তু হয়তো সমাজ হঠাৎ করে রসাতলে যাচ্ছে না। হয়তো যা সব সময়ই ছিল, প্রযুক্তির বদৌলতে আমরা এখন শুধু তার আরও বেশি কিছু দেখতে পাচ্ছি।

তাই ৮০ ও ৯০-এর দশকের নস্টালজিয়ার মূল সমস্যা হতে পারে আমাদের স্মৃতির বাছাই। আমরা সেই অংশগুলোই মনে রাখি, যা আমাদের ভালো অনুভব করায়। অথচ যেসব বিষয় বর্তমানকে কেন এমন দেখাচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে, সেগুলো ভুলে যাই।

কথিত সেই গৌরবময় দশকগুলোতে বেড়ে ওঠা মানুষগুলো যদি এখন দেশ ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকেন, তাহলে তাঁদের নিজেদের কাছেই একটি সহজ প্রশ্ন রাখা যায়—আপনাদের বেড়ে ওঠার সময়টা যদি সত্যিই এত অসাধারণ হয়ে থাকে, তাহলে আপনারা যে সমাজ গড়ে তুলেছেন এবং এখনো যেভাবে গড়ে চলেছেন, তার অবস্থা এতটা হতাশাজনক কেন?