ঢাকা ১০:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি বাস্তবে পরিণত হচ্ছে: প্রধান বিচারপতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

মানবাধিকারের আগে ‘মানব’ শব্দটি ভুলে গেছি: জুবায়ের রহমান চৌধুরী

বর্তমান বিশ্বে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি দিন দিন বাস্তবে পরিণত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। তিনি বলেছেন, পৃথিবীর দিকে তাকালেই এর উদাহরণ দেখা যায়। তবে মানবতা ও মানবাধিকারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ‘সমসাময়িক বিশ্বে সার্বভৌমত্ব, মানবতা ও আইন’ শীর্ষক দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আজকের পৃথিবীতে “জোর যার মুল্লুক তার”—এই নীতিটি দিন দিন বাস্তবে পরিণত হচ্ছে। পৃথিবীর দিকে তাকালেই আমরা এর উদাহরণ দেখতে পাই। আমি নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম বলতে চাই না। শালীনতার খাতিরে সেটি থেকে বিরত থাকছি। কিন্তু আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত মানবতা ও মানবাধিকার।’

বর্তমান বিশ্বে মানুষের জীবনই সবচেয়ে সহজে বিসর্জন দেওয়া যায় এমন সম্পদে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে সহজে বিসর্জন দেওয়া যায় এমন পণ্য বা সম্পদ হলো মানুষের জীবন। আমি আমার এই মতের ওপর অটল। এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। এ জন্য কোনো তথ্যসূত্র বা উদ্ধৃতি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। চারপাশে তাকালেই তা দেখতে পাবেন।’

মানবাধিকারের বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগের সমালোচনা করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বাঘের অধিকার, কচ্ছপের অধিকার, এমনকি শিশুদের অধিকার, শ্রমের অধিকার, শ্রমিকদের অধিকার—এভাবে আমরা অধিকারের নানা শ্রেণিবিভাগ করে থাকি। কিন্তু মানবাধিকার তো মানবাধিকারই। আমরা অধিকারের নানা বিষয় নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, অধিকারের আগে থাকা “মানব” শব্দটিই যেন ভুলে গেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কি এমন একটি দিনের কথা বলতে পারি, যেদিন কোনো একটি দেশ, এমনকি কোনো একটি শহরেও একজন নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি ঘটেনি? এমন কোনো দিনের কথা কি আপনার মনে পড়ে? আমার তো পড়ে না। তবে আমার মতের সংশোধন হলে আমি তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত।’

অনুষ্ঠানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, মানবতা ও আইনের মধ্যকার সম্পর্ক নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সার্বভৌমত্ব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি মৌলিক নীতি। তবে এর পাশাপাশি মানবিক মর্যাদা রক্ষা, মৌলিক অধিকার সুরক্ষা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করতে হবে।

উপাচার্য আরও বলেন, আইনের শাসন কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে না; বরং অন্যায়, বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সুরক্ষাকবচ হিসেবেও ভূমিকা পালন করতে হবে।

বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা, বেসরকারি বাহিনী, অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক সংঘাত নতুন আইনি ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উদ্ভাবনী আইনি চিন্তাভাবনা, আন্তবিষয়ক গবেষণা এবং আরও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আব্দুল আলীম, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুনুর রশীদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মতিয়ার রহমান, আইন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. সাইদা আনজু, দেশি-বিদেশি গবেষক ও শিক্ষাবিদ এবং আইন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৯:১৬:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
৪৫১০ বার পড়া হয়েছে

‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি বাস্তবে পরিণত হচ্ছে: প্রধান বিচারপতি

আপডেট সময় ০৯:১৬:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

মানবাধিকারের আগে ‘মানব’ শব্দটি ভুলে গেছি: জুবায়ের রহমান চৌধুরী

বর্তমান বিশ্বে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি দিন দিন বাস্তবে পরিণত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। তিনি বলেছেন, পৃথিবীর দিকে তাকালেই এর উদাহরণ দেখা যায়। তবে মানবতা ও মানবাধিকারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ‘সমসাময়িক বিশ্বে সার্বভৌমত্ব, মানবতা ও আইন’ শীর্ষক দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আজকের পৃথিবীতে “জোর যার মুল্লুক তার”—এই নীতিটি দিন দিন বাস্তবে পরিণত হচ্ছে। পৃথিবীর দিকে তাকালেই আমরা এর উদাহরণ দেখতে পাই। আমি নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম বলতে চাই না। শালীনতার খাতিরে সেটি থেকে বিরত থাকছি। কিন্তু আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত মানবতা ও মানবাধিকার।’

বর্তমান বিশ্বে মানুষের জীবনই সবচেয়ে সহজে বিসর্জন দেওয়া যায় এমন সম্পদে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে সহজে বিসর্জন দেওয়া যায় এমন পণ্য বা সম্পদ হলো মানুষের জীবন। আমি আমার এই মতের ওপর অটল। এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। এ জন্য কোনো তথ্যসূত্র বা উদ্ধৃতি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। চারপাশে তাকালেই তা দেখতে পাবেন।’

মানবাধিকারের বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগের সমালোচনা করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বাঘের অধিকার, কচ্ছপের অধিকার, এমনকি শিশুদের অধিকার, শ্রমের অধিকার, শ্রমিকদের অধিকার—এভাবে আমরা অধিকারের নানা শ্রেণিবিভাগ করে থাকি। কিন্তু মানবাধিকার তো মানবাধিকারই। আমরা অধিকারের নানা বিষয় নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, অধিকারের আগে থাকা “মানব” শব্দটিই যেন ভুলে গেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কি এমন একটি দিনের কথা বলতে পারি, যেদিন কোনো একটি দেশ, এমনকি কোনো একটি শহরেও একজন নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি ঘটেনি? এমন কোনো দিনের কথা কি আপনার মনে পড়ে? আমার তো পড়ে না। তবে আমার মতের সংশোধন হলে আমি তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত।’

অনুষ্ঠানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, মানবতা ও আইনের মধ্যকার সম্পর্ক নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সার্বভৌমত্ব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি মৌলিক নীতি। তবে এর পাশাপাশি মানবিক মর্যাদা রক্ষা, মৌলিক অধিকার সুরক্ষা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করতে হবে।

উপাচার্য আরও বলেন, আইনের শাসন কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে না; বরং অন্যায়, বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সুরক্ষাকবচ হিসেবেও ভূমিকা পালন করতে হবে।

বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা, বেসরকারি বাহিনী, অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক সংঘাত নতুন আইনি ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উদ্ভাবনী আইনি চিন্তাভাবনা, আন্তবিষয়ক গবেষণা এবং আরও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আব্দুল আলীম, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুনুর রশীদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মতিয়ার রহমান, আইন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. সাইদা আনজু, দেশি-বিদেশি গবেষক ও শিক্ষাবিদ এবং আইন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।