ঢাকা ১২:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo সাজেকে দুই আঞ্চলিক দলের সশস্ত্র সংঘর্ষ, আতঙ্কে পর্যটক ও স্থানীয়রা Logo খুলনায় ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের বহরে ককটেল নিক্ষেপ, আতঙ্কে ছুটোছুটি Logo ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে মিরপুর-আশুলিয়ায় শ্রমিক বিক্ষোভ, ৩০ কারখানায় ছুটি Logo হেমন্তে আবহাওয়া পরিবর্তনে বাড়ছে অসুস্থতার ঝুঁকি, সুস্থ থাকতে মানতে হবে যেসব সতর্কতা Logo ভরিতে ৫ হাজার ৪৮২ টাকা কমল স্বর্ণের দাম Logo ৯ মাস পর অভিনয়ে ফিরলেন তানিয়া বৃষ্টি Logo এইচএসসির ফলাফলে দেশসেরা আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ Logo তাহসিফ সাউরি হত্যা মামলায় দীপের চার দিনের রিমান্ড Logo গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে: শফিকুর রহমান Logo প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ফলপ্রসূ, এক লাখ কোটি ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা

সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে নিহত ৯, নিরাপত্তা অবহেলার অভিযোগ

নিজস্ব সংবাদ :

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় ‘ফেরদৌস স্টিল’ নামের একটি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক গুরুতর অসুস্থ হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৮টার দিকে ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, ইয়ার্ডে নোঙর করে রাখা একটি পুরোনো এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজের তলার দিকে স্ক্র্যাপ কাটিংয়ের কাজ করছিলেন শ্রমিকরা। ফোরম্যানের নেতৃত্বে জাহাজের একটি ট্যাংকের চারপাশ কাটার সময় ভেতরে জমে থাকা তরল বর্জ্য ও বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে।

এতে তীব্র অক্সিজেন সংকট তৈরি হলে শ্রমিকরা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে একের পর এক অচেতন হয়ে পড়েন। প্রথম দুজন শ্রমিক জ্ঞান হারানোর পর তাদের উদ্ধারে এগিয়ে গিয়ে আরও কয়েকজন শ্রমিক, কাটিং ফোরম্যান ও মাস্ক পরিহিত এক নিরাপত্তাকর্মীও গ্যাসে আক্রান্ত হন।

উদ্ধারের সময় বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে আরও এক শ্রমিক ইয়ার্ডের বাইরে কাদা-মাটিতে অচেতন হয়ে পড়েন। ঘটনাস্থলেই পাঁচজনের মৃত্যু হয়। পরে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়।

নিহতদের মধ্যে ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা সানি জলদাস, পলাশ জলদাস, হাবিবুর রহমান এবং দুই ভাই মনসুর আলী ও নাসির উদ্দিনের পরিচয় পাওয়া গেছে।

অ্যাম্বুলেন্স ও অক্সিজেন না থাকার অভিযোগ

দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডের শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, আহতদের উদ্ধারের পরও ইয়ার্ডের ভেতরে কোনো অ্যাম্বুলেন্স, অক্সিজেন সিলিন্ডার বা পর্যাপ্ত প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না।

তাদের দাবি, সময়মতো অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া গেলে অনেকের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো।

স্থানীয় শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও ইয়ার্ডে কাজ চলছিল। এমনকি জাহাজের ট্যাংকের ভেতরে গ্যাস পরীক্ষা না করেই শ্রমিকদের সেখানে প্রবেশ করানো হয়। তাদের মতে, এটি কর্তৃপক্ষের গুরুতর নিরাপত্তা অবহেলার প্রমাণ।

আগেই নিরাপত্তা ত্রুটি চিহ্নিত, নোটিশের পরও ব্যবস্থা হয়নি

দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে পুরোনো অভিযোগও সামনে এসেছে।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) জানিয়েছে, গত ২ ফেব্রুয়ারি নিয়মিত পরিদর্শনে গিয়ে শিপইয়ার্ডটিতে বেশ কিছু নিরাপত্তা ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়েছিল। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে নোটিশও দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ৪ মে ও ৮ জুন তাগিদপত্র দেওয়া হলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ঘাটতি দূর করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বলে জানিয়েছে ডিআইএফই।

বারবার নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে ফেরদৌস করপোরেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে মামলা করেন ডিআইএফই পরিদর্শক মো. সাহেদ পারভেজ তালুকদার।

শ্রম আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায়ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করে ইয়ার্ডে কাজ চলছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

পরিদর্শন দলের ওপর হামলা

দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা যৌথভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তবে ডিআইএফইর একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থলে গেলে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলার শিকার হন দুই শ্রম পরিদর্শক। এতে তারা গুরুতর আহত হন।

ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এলএনজি বহনকারী জাহাজ কাটার আগে নিয়ম অনুযায়ী জাহাজটিকে সম্পূর্ণভাবে ‘গ্যাসমুক্ত’ করার কথা। কিন্তু তা করা হয়নি বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে জাহাজের ভেতরে বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি হয়ে দুর্ঘটনাটি ঘটতে পারে।

ঘটনার কারণ ও দায় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ১০:২৬:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
৪৫৬৭ বার পড়া হয়েছে

সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে নিহত ৯, নিরাপত্তা অবহেলার অভিযোগ

আপডেট সময় ১০:২৬:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় ‘ফেরদৌস স্টিল’ নামের একটি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক গুরুতর অসুস্থ হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৮টার দিকে ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, ইয়ার্ডে নোঙর করে রাখা একটি পুরোনো এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজের তলার দিকে স্ক্র্যাপ কাটিংয়ের কাজ করছিলেন শ্রমিকরা। ফোরম্যানের নেতৃত্বে জাহাজের একটি ট্যাংকের চারপাশ কাটার সময় ভেতরে জমে থাকা তরল বর্জ্য ও বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে।

এতে তীব্র অক্সিজেন সংকট তৈরি হলে শ্রমিকরা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে একের পর এক অচেতন হয়ে পড়েন। প্রথম দুজন শ্রমিক জ্ঞান হারানোর পর তাদের উদ্ধারে এগিয়ে গিয়ে আরও কয়েকজন শ্রমিক, কাটিং ফোরম্যান ও মাস্ক পরিহিত এক নিরাপত্তাকর্মীও গ্যাসে আক্রান্ত হন।

উদ্ধারের সময় বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে আরও এক শ্রমিক ইয়ার্ডের বাইরে কাদা-মাটিতে অচেতন হয়ে পড়েন। ঘটনাস্থলেই পাঁচজনের মৃত্যু হয়। পরে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়।

নিহতদের মধ্যে ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা সানি জলদাস, পলাশ জলদাস, হাবিবুর রহমান এবং দুই ভাই মনসুর আলী ও নাসির উদ্দিনের পরিচয় পাওয়া গেছে।

অ্যাম্বুলেন্স ও অক্সিজেন না থাকার অভিযোগ

দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডের শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, আহতদের উদ্ধারের পরও ইয়ার্ডের ভেতরে কোনো অ্যাম্বুলেন্স, অক্সিজেন সিলিন্ডার বা পর্যাপ্ত প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না।

তাদের দাবি, সময়মতো অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া গেলে অনেকের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো।

স্থানীয় শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও ইয়ার্ডে কাজ চলছিল। এমনকি জাহাজের ট্যাংকের ভেতরে গ্যাস পরীক্ষা না করেই শ্রমিকদের সেখানে প্রবেশ করানো হয়। তাদের মতে, এটি কর্তৃপক্ষের গুরুতর নিরাপত্তা অবহেলার প্রমাণ।

আগেই নিরাপত্তা ত্রুটি চিহ্নিত, নোটিশের পরও ব্যবস্থা হয়নি

দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে পুরোনো অভিযোগও সামনে এসেছে।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) জানিয়েছে, গত ২ ফেব্রুয়ারি নিয়মিত পরিদর্শনে গিয়ে শিপইয়ার্ডটিতে বেশ কিছু নিরাপত্তা ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়েছিল। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে নোটিশও দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ৪ মে ও ৮ জুন তাগিদপত্র দেওয়া হলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ঘাটতি দূর করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বলে জানিয়েছে ডিআইএফই।

বারবার নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে ফেরদৌস করপোরেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে মামলা করেন ডিআইএফই পরিদর্শক মো. সাহেদ পারভেজ তালুকদার।

শ্রম আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায়ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করে ইয়ার্ডে কাজ চলছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

পরিদর্শন দলের ওপর হামলা

দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা যৌথভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তবে ডিআইএফইর একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থলে গেলে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলার শিকার হন দুই শ্রম পরিদর্শক। এতে তারা গুরুতর আহত হন।

ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এলএনজি বহনকারী জাহাজ কাটার আগে নিয়ম অনুযায়ী জাহাজটিকে সম্পূর্ণভাবে ‘গ্যাসমুক্ত’ করার কথা। কিন্তু তা করা হয়নি বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে জাহাজের ভেতরে বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি হয়ে দুর্ঘটনাটি ঘটতে পারে।

ঘটনার কারণ ও দায় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।