ঢাকা ১০:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘিরে ইসরায়েলে অসন্তোষ, বাড়ছে রাজনৈতিক বিভাজন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের ভেতরে অসন্তোষ, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশটির বিভিন্ন শহরের নাগরিক, বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই চুক্তি ইসরায়েলের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং দেশটিকে আগের চেয়ে আরও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে।

তেল আবিবের কাছাকাছি রেহোভট শহরে সাধারণ মানুষের মধ্যে চুক্তি নিয়ে ক্ষোভ স্পষ্ট। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া এই সমঝোতা ইসরায়েলের স্বার্থের পরিপন্থী। ৫৫ বছর বয়সী আভি পেরেজ বলেন, “মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের মূল সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান না করেই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হয়েছে। ফলে ইসরায়েল এখন আগের তুলনায় আরও বেশি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে বলে তাদের ধারণা।

এদিকে লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে নতুন করে সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। হিজবুল্লাহর হামলায় এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাসহ চার ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এতে হিজবুল্লাহর অন্তত ১৮ সদস্য নিহত এবং ৩৩ জন আহত হন।

ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের একাংশ চুক্তিটিকে ‘আত্মসমর্পণ’ ও ‘অপমানজনক সমঝোতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে, ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নির্মূল কিংবা সরকার পরিবর্তনের মতো ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননকে ঘিরে হওয়া সমঝোতাও নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, এর ফলে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়েও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। দুর্নীতির মামলায় বিচারাধীন এই নেতা এখন ভোটারদের বোঝাতে চেষ্টা করছেন যে, তিনিই দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম।

জনমত বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু সেগুলো পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় জনগণের একাংশের মধ্যে তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তবে সব সমালোচনার মধ্যেও নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন পুরোপুরি কমে যায়নি। সাম্প্রতিক এক জরিপে অনির্ধারিত ভোটারদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ ইরান ইস্যুতে তার নেতৃত্বাধীন জোটকেই সবচেয়ে কার্যকর বলে মনে করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা, যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে ঘিরে ইসরায়েলের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতানিয়াহু এখনও শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে থাকলেও দেশটির জনমত এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিভক্ত।

স্থানীয় চিকিৎসক লি নোভিকের ভাষায়, “ইসরায়েলিরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিভক্ত। নিরাপত্তা ইস্যুর আড়ালে মূল্যস্ফীতি, আবাসন সংকটসহ সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলো গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে।”

পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চুক্তি, লেবানন পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট মিলিয়ে ইসরায়েলের আগামী নির্বাচন দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০১:৪৮:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
৪৫৭১ বার পড়া হয়েছে

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘিরে ইসরায়েলে অসন্তোষ, বাড়ছে রাজনৈতিক বিভাজন

আপডেট সময় ০১:৪৮:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের ভেতরে অসন্তোষ, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশটির বিভিন্ন শহরের নাগরিক, বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই চুক্তি ইসরায়েলের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং দেশটিকে আগের চেয়ে আরও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে।

তেল আবিবের কাছাকাছি রেহোভট শহরে সাধারণ মানুষের মধ্যে চুক্তি নিয়ে ক্ষোভ স্পষ্ট। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া এই সমঝোতা ইসরায়েলের স্বার্থের পরিপন্থী। ৫৫ বছর বয়সী আভি পেরেজ বলেন, “মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের মূল সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান না করেই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হয়েছে। ফলে ইসরায়েল এখন আগের তুলনায় আরও বেশি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে বলে তাদের ধারণা।

এদিকে লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে নতুন করে সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। হিজবুল্লাহর হামলায় এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাসহ চার ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এতে হিজবুল্লাহর অন্তত ১৮ সদস্য নিহত এবং ৩৩ জন আহত হন।

ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের একাংশ চুক্তিটিকে ‘আত্মসমর্পণ’ ও ‘অপমানজনক সমঝোতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে, ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নির্মূল কিংবা সরকার পরিবর্তনের মতো ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননকে ঘিরে হওয়া সমঝোতাও নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, এর ফলে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়েও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। দুর্নীতির মামলায় বিচারাধীন এই নেতা এখন ভোটারদের বোঝাতে চেষ্টা করছেন যে, তিনিই দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম।

জনমত বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু সেগুলো পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় জনগণের একাংশের মধ্যে তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তবে সব সমালোচনার মধ্যেও নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন পুরোপুরি কমে যায়নি। সাম্প্রতিক এক জরিপে অনির্ধারিত ভোটারদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ ইরান ইস্যুতে তার নেতৃত্বাধীন জোটকেই সবচেয়ে কার্যকর বলে মনে করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা, যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে ঘিরে ইসরায়েলের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতানিয়াহু এখনও শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে থাকলেও দেশটির জনমত এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিভক্ত।

স্থানীয় চিকিৎসক লি নোভিকের ভাষায়, “ইসরায়েলিরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিভক্ত। নিরাপত্তা ইস্যুর আড়ালে মূল্যস্ফীতি, আবাসন সংকটসহ সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলো গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে।”

পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চুক্তি, লেবানন পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট মিলিয়ে ইসরায়েলের আগামী নির্বাচন দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।