বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ নিল হুথিরা, বাড়ছে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি নিয়ে শঙ্কা
লোহিতসাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। একই সঙ্গে প্রণালির মাঝামাঝি অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন বা পেরিম দ্বীপ এবং লোহিতসাগরের উপকূলীয় শহর মোখার নিয়ন্ত্রণও নিয়েছে তারা। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে হুথিদের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
শুক্রবার মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী পিছু হটার পর হুথি যোদ্ধারা মায়ুন দ্বীপ ও লোহিতসাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে অবস্থান নিয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার কৌশলগত বন্দরনগরী মোখার নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা।
মায়ুন দ্বীপটি বাব আল-মান্দেব প্রণালির মাঝামাঝি অবস্থানে। দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ প্রণালির নৌ চলাচল পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এপি জানিয়েছে, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা এবং একজন হুথি কর্মকর্তা মায়ুন দ্বীপ দখলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গত সপ্তাহ থেকে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে হুথিরা। কয়েক দিনের তীব্র লড়াইয়ের পর লোহিতসাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা ও মোখার নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা। এরপর বাব আল-মান্দেবের আরও কাছাকাছি পৌঁছে যায় হুথি যোদ্ধারা।
হুথিদের এই অগ্রযাত্রার মধ্যে সৌদি আরব পাল্টা বিমান হামলা চালিয়েছে। হুথি-নিয়ন্ত্রিত একটি সম্প্রচারমাধ্যমের বরাত দিয়ে এপি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার মোখার বিমানবন্দরে হামলা চালায় সৌদি বাহিনী। তবে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিতসাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই নৌপথ দিয়েই সুয়েজ খাল হয়ে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা হয়। ফলে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য প্রণালিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হুথিদের হামলার কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জন্যও বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরবের তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে লোহিতসাগর ও বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব বাড়ছে।
চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি এএফপিকে বলেন, সৌদি আরব যুদ্ধ এড়ানোর সব চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। হুথিরা সীমা অতিক্রম করেছে এবং এখন ব্যবস্থা না নিলে সৌদি আরবকে ভবিষ্যতে আরও বড় মূল্য দিতে হতে পারে।
হুথিদের অগ্রযাত্রার প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়েছে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে ১০৯ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ডব্লিউটিআইয়ের দামও ১০০ ডলারের ওপরে ওঠে। তবে এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে শুধু বাব আল-মান্দেবের পরিস্থিতিই নয়, হরমুজ প্রণালির সংকটসহ মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক উত্তেজনাও ভূমিকা রাখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাব আল-মান্দেবের ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হলে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিও যখন সংঘাতের কারণে ব্যাপকভাবে ব্যাহত, তখন লোহিতসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে হুথিদের অগ্রযাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এদিকে ইয়েমেনে নতুন করে তীব্র লড়াই শুরু হওয়ায় ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পূর্ণমাত্রার সংঘাত ফিরে আসার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহের লড়াইয়ে ৪৬ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

























