দেশে বিদ্যুৎ খাতে ডিজিটাল সেবার নামে চালু হওয়া প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থা ক্রমেই সাধারণ গ্রাহকদের জন্য এক বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, অপচয় রোধ এবং গ্রাহকসেবার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ ব্যবস্থা চালু করা হলেও বাস্তবে বহু গ্রাহকের অভিজ্ঞতা তার বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে।
প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের অন্যতম অভিযোগ হলো, নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ রিচার্জ করলেও পুরো অর্থ ব্যালেন্সে প্রতিফলিত হয় না। বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলো ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট, বকেয়া সমন্বয়সহ নানা খাতের ব্যাখ্যা দিলেও অধিকাংশ গ্রাহকের কাছে এসব হিসাব অস্পষ্ট থেকে যায়। ফলে স্বচ্ছতার বদলে বিভ্রান্তিই বাড়ছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সামান্য ভুলে মিটার লক হয়ে যাওয়া, রিচার্জ করতে দেরি হলে কোনো কার্যকর পূর্বসতর্কতা ছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘ সংখ্যার টোকেন কোড ব্যবহারে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ। প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞ ও বয়স্ক গ্রাহকদের জন্য এসব জটিলতা অনেক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে।
প্রিপেইড মিটারের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন চার্জ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অনেকের অভিযোগ, অ্যানালগ বা পোস্টপেইড ব্যবস্থার তুলনায় বিদ্যুৎ ব্যয় বেড়ে গেছে। কোথাও কোথাও অস্বাভাবিক বা ভুতুড়ে বিলের ঘটনাও সামনে এসেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রায়ই প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা তথ্যগত ভুলের কথা বলে ব্যাখ্যা দেয়, তবু এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি জনমনে আস্থাহীনতা সৃষ্টি করছে।
প্রযুক্তি নিজে কখনো সমস্যা নয়; সমস্যা হয় যখন তার প্রয়োগে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গ্রাহকস্বার্থ উপেক্ষিত হয়। বিশ্বের বহু দেশে প্রিপেইড মিটার সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে গ্রাহক সহজে ব্যয়ের হিসাব বুঝতে পারেন এবং সেবার মানও উন্নত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো সেই কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছতা ও গ্রাহকবান্ধব ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থার অভিযোগগুলোকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে চার্জ ও বিলিং ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করতে হবে, অপ্রয়োজনীয় জটিলতা দূর করতে হবে এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবন সহজ করা, নতুন ভোগান্তি সৃষ্টি করা নয়। অন্যথায় প্রযুক্তির সুফল নয়, তার প্রতি মানুষের অনাস্থাই বাড়তে থাকবে।