প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ফলপ্রসূ, এক লাখ কোটি ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা
দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর অত্যন্ত কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ এক লাখ কোটি ইয়েন বা প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনাকেও সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।
শুক্রবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
হুমায়ুন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতা অব্যাহত রাখা ও তা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্র আরও প্রশস্ত হয়েছে। দুই দেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগিতাকে পারস্পরিক কল্যাণকর অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ অংশীদারত্বে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সফরটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করেছে।
সফরটিকে অত্যন্ত কার্যকর ও ফলপ্রসূ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের উন্নয়ন অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় হয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
এক লাখ কোটি ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ এক লাখ কোটি ইয়েন বা প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। এ ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
কবে নাগাদ এসব বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পারস্পরিক পরামর্শ ও মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ আলোচনার পর উভয় পক্ষের সুবিধাজনক সময়ে শিগগিরই জাপানের একটি অর্থনৈতিক প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, জাতীয় অগ্রাধিকার, সাশ্রয়যোগ্যতা, প্রতিযোগিতার সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করবে। সরকার এমন বিনিয়োগকেই অগ্রাধিকার দেবে, যা ব্যয়ের বিপরীতে যথাযথ সুফল নিশ্চিত করবে এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে।
অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিআইজি-বি
হুমায়ুন কবির বলেন, দুই দেশ দীর্ঘদিনের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিআইজি-বি) উদ্যোগকে ‘বিআইজি-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ বা অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিআইজি-বি হিসেবে উন্নীত করতে সম্মত হয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের প্রতিফলন ঘটেছে।
এ উদ্যোগে জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প স্থাপনা, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং যোগাযোগব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়নের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে সরকার জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে বলেও জানান তিনি।
বড় প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো ও উন্নয়ন অগ্রাধিকারগুলোতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে জাপান। আলোচনায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতি, ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা বা মাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণ, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় ভবিষ্যতে জাপানের সহযোগিতার বিষয় উঠে আসে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থনৈতিক সহনশীলতা জোরদার এবং জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে জাপানের ৫ হাজার কোটি ইয়েন বা প্রায় ৩১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের জরুরি সহায়তা ঋণের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
জাইকার প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকার সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জাপানের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সময়মতো সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে তিনি সহজ শর্তে অর্থায়ন অব্যাহত রাখা এবং কারিগরি সহযোগিতা সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।
মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে গুরুত্ব
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরে মানবসম্পদ উন্নয়ন, কারিগরি সহযোগিতা ও শিল্পের আধুনিকায়ন গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে উঠে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী ইউনিক্লোর মূল প্রতিষ্ঠান ফাস্ট রিটেইলিং, মারুবেনি করপোরেশন, মিতসুবিশি করপোরেশন, টয়োটা সুশো করপোরেশনসহ জাপানের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
এসব আলোচনায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদনশিল্প এবং অবকাঠামো খাতে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিষয় গুরুত্ব পায়।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে জাপান
জাপান সফরে রোহিঙ্গা সংকট ও মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাপান বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে। এ বিষয়ে জাপানের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
তবে সংকটের মূল সমাধান মিয়ানমারের হাতে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশটিকে আলোচনায় আসতে হবে এবং সংকট সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের একার পক্ষে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।























