তালাকের অজুহাতে স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ নয়, দেনমোহরও পরিশোধ করতে হবে: হাইকোর্ট
তালাকের অজুহাত দেখিয়ে স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ কিংবা দেনমোহর পরিশোধ এড়ানো যাবে না বলে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ মা-বাবার তালাক সংক্রান্ত বিরোধের ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি শিশুর স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার।
বৃহস্পতিবার রিটকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান রায় প্রকাশের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। বিচারপতি আবদুর রহমানের নেতৃত্বাধীন একক হাইকোর্ট বেঞ্চের স্বাক্ষরের পর রায়টি প্রকাশ করা হয়।
আদালতে স্বামীর পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. শহিদুল ইসলাম। অন্যদিকে স্ত্রীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী তানজিলা রহমান জুঁই ও ইফাত হাসান শাম্মি।
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, আইন অনুযায়ী প্রমাণিত বা কার্যকর নয়— এমন তালাকের অজুহাতে স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ কিংবা দেনমোহরের ডিক্রির বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না। কোনো সক্ষম আদালত ডিক্রি স্থগিত না করা পর্যন্ত তা কার্যকর থাকবে এবং এক্সিকিউশন কোর্ট সেই ডিক্রি বাস্তবায়ন করতে বাধ্য।
আদালত আরও বলেন, শুধুমাত্র নতুন একটি মামলা দায়ের করার কারণে পূর্বে দেওয়া চূড়ান্ত ডিক্রির কার্যকারিতা স্থগিত করা যাবে না। এক্সিকিউশন কোর্টের কাজ কেবল বিদ্যমান ডিক্রি বাস্তবায়ন করা। তালাক বৈধ কি না বা বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান কি না— এ ধরনের নতুন বিরোধ নিষ্পত্তির এখতিয়ার ওই আদালতের নেই।
রায়ে বলা হয়, যে তালাক আইন অনুযায়ী প্রমাণিত নয় বা কার্যকর নয়, তার কোনো আইনগত বৈধতা নেই। ফলে এমন তালাক বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটায় না এবং ভরণপোষণ বা দেনমোহরের ডিক্রি বাস্তবায়নে কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারে না।
হাইকোর্ট আরও স্পষ্ট করেন, বিবাহ, তালাক, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং বৈবাহিক অধিকারসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র এখতিয়ার পারিবারিক আদালতের।
নাবালক সন্তানের অধিকার প্রসঙ্গে আদালত বলেন, সন্তানের ভরণপোষণ একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার। মা-বাবার মধ্যে তালাক নিয়ে বিরোধ থাকলেও সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ করা যাবে না। কোনো পিতা তালাক-সংক্রান্ত বিরোধের অজুহাতে সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।
রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়, যদি পূর্বে দাবি করা তালাক আইনগতভাবে অকার্যকর প্রমাণিত হয় এবং স্বামী পরবর্তীতে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটাতে চান, তবে তিনি আইন অনুযায়ী নতুন করে তালাক দিতে পারবেন। তবে এতে পূর্বে প্রদত্ত দেনমোহর ও ভরণপোষণের দায় থেকে তিনি মুক্তি পাবেন না।
হাইকোর্ট রায়ে তিনটি মৌলিক নীতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন— তালাকের আইনগত কার্যকারিতা অবশ্যই আইন অনুযায়ী প্রমাণিত হতে হবে, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ একটি স্বাধীন অধিকার এবং নতুন মামলা দায়ের করে কোনো চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়ন বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত করা যাবে না।
আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, এই রায় নারী ও শিশুর অধিকার সুরক্ষা এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালে বাদী-বিবাদীর বিয়ে হয়। পরে স্ত্রী ও তাদের নাবালক কন্যার পক্ষে পারিবারিক আদালতে দেনমোহর ও ভরণপোষণের মামলা করা হয়। ওই মামলায় স্বামী দাবি করেন, তিনি আগেই স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। তবে আইন অনুযায়ী তালাকের বৈধতা প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় পারিবারিক আদালত স্ত্রী ও সন্তানের পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের ডিক্রি দেন।
পরবর্তীতে স্বামী নতুন একটি ঘোষণামূলক মামলা করে তালাক কার্যকর হয়েছে দাবি করে ডিক্রির বাস্তবায়ন স্থগিতের আবেদন করেন। অধস্তন আদালত সেই আবেদন খারিজ করলে তিনি হাইকোর্টে আবেদন করেন। শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল খারিজ করে অধস্তন আদালতের আদেশ বহাল রাখেন এবং স্বামীকে দেনমোহরের বকেয়াসহ স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের সব বকেয়া ভরণপোষণ পরিশোধের নির্দেশ দেন।





















