এসএসসিতে অকৃতকার্যদের জন্য নতুন কর্মপরিকল্পনা, ৩ মাসে পুনঃপরীক্ষার সুযোগ বিবেচনা করছে সরকারঃ মাহদী আমিন
এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য ও প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, মেধা ও সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে যাচ্ছে সরকার। পাশাপাশি অকৃতকার্য বিষয়ে এক বছর অপেক্ষা না করে তিন মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যায় কি না, তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন।
আজ শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘চ্যালেঞ্জড স্টুডেন্টস কনভেনশন ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গণস্বাক্ষরতা অভিযান ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন একটি কর্মপদ্ধতি তৈরি করা হবে, যেখানে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতার মূল্যায়ন করা হবে। এসব শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। তাঁদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান ও ক্যারিয়ারের সুযোগ তৈরিতে সরকার কাজ করবে।
তিনি বলেন, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যান ও সচিবদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। যেসব শিক্ষার্থী কারিগরি ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণে আগ্রহী, তাঁদের নিজ নিজ এলাকার টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার ও বিভিন্ন কারিগরি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। কারও ভালো ব্যবসায়িক ধারণা থাকলে তাঁকে প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থায়নের ব্যবস্থাও করা হতে পারে।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাপানি, কোরীয়, চীনা কিংবা ইউরোপের কোনো দেশের ভাষা তিন থেকে ছয় মাসে শিখে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। স্বল্পমেয়াদি কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে দ্রুত আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এসএসসির পর উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা থাকে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থী সরাসরি কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারবেন।
তিন মাসে পুনঃপরীক্ষার সুযোগ বিবেচনা
এসএসসিতে এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ নিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, অনেক শিক্ষক ও অভিভাবক এক বছর অপেক্ষা না করিয়ে তিন মাসের মধ্যে অকৃতকার্য বিষয়ে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন।
তিনি বলেন, বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শিক্ষার্থীদের ফলাফলের ভিত্তিতে বৈষম্য না করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, যারা জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে, তাদের প্রতি রাষ্ট্রের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি যারা প্রত্যাশিত ফল পায়নি কিংবা কোনো বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের প্রতিও রাষ্ট্রের সমান দায়বদ্ধতা রয়েছে।
ফল খারাপের পেছনে থাকতে পারে নানা কারণ
মাহ্দী আমিন বলেন, একজন শিক্ষার্থীর ফল খারাপ হওয়ার পেছনে সব সময় মেধার ঘাটতি দায়ী নয়। পারিবারিক ও আর্থিক অসংগতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের অভাব, পরীক্ষার আগে অসুস্থতা কিংবা পারিবারিক সংকটের মতো নানা কারণ থাকতে পারে।
এসব সমস্যা সমাধানে সরকার সমন্বিতভাবে কাজ করবে জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষকসংকট থাকলে শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষের সংকট থাকলে অবকাঠামো নির্মাণ এবং আর্থিক অসংগতি থাকলে সহায়তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
শিক্ষা সংস্কারের অংশ হিসেবে পূর্ণাঙ্গ খাতা পুনঃনিরীক্ষণ চালু করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে শুধু নম্বরের যোগ-বিয়োগ নয়, প্রতিটি উত্তরের গুণগত মানও নতুন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সরকার গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই এ ধরনের সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব হলে এক বছর অপেক্ষা না করিয়ে তিন মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়াও সম্ভব হতে পারে।
‘এসএসসিতে খারাপ ফল মানেই জীবনে ব্যর্থতা নয়’
শিক্ষার্থীদের হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, এসএসসি বা এইচএসসিতে ভালো ফলাফল ভবিষ্যতে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে, তবে তা সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। একইভাবে পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল না পাওয়ার অর্থও জীবনে ব্যর্থতা নয়।
তিনি বলেন, কোনো শিক্ষার্থী একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হলেও অন্য বিষয়ে তার ভালো ফল থাকতে পারে। কেউ খেলাধুলায় দক্ষ, কেউ সংস্কৃতিচর্চায় আগ্রহী, কেউ বিজ্ঞানে উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী, আবার কারও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকতে পারে। একটি বিষয়ে খারাপ ফলের কারণে একজন শিক্ষার্থীর অন্য সব মেধা ও সৃজনশীলতা নষ্ট হয়ে যায় না।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, পৃথিবীতে অনেক আবিষ্কারক, উদ্যোক্তা, শিল্পী ও খেলোয়াড় রয়েছেন, যাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সাফল্য খুব বেশি ছিল না। তাই শুধু সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে একজন মানুষের জীবন মূল্যায়ন করা উচিত নয়। নিজেদের ওপর আস্থা রেখে মেধা ও যোগ্যতার বিকাশে এগিয়ে যেতে হবে।
এবার এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ছয় লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত ফল পায়নি উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভাগ্য পরিবর্তনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে না পারলে কোনো উন্নয়নই অর্থবহ হবে না।
অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজের সব অংশীজনের প্রতি শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা সবার সন্তানতুল্য। প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কিংবা না পাওয়া—সব শিক্ষার্থীর পাশে থাকবে সরকার।
গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীর সভাপতিত্বে সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন গণস্বাক্ষরতা অভিযান কাউন্সিলের চেয়ারপারসন ড. ইরাম মরিয়ম, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস ও ডা. আরিফুর রহমানসহ অনেকে।


























