স্বাধীন সাংবাদিকতা গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি: বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্সে বক্তারা
গণতন্ত্রের বিকাশ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন সাংবাদিকতার গুরুত্ব অপরিসীম বলে মন্তব্য করেছেন দেশের ও বিদেশের গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। তারা বলেন, শুধু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, রাষ্ট্র ও সরকারের সাফল্যের জন্যও স্বাধীন সাংবাদিকতা অপরিহার্য। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করাও জরুরি।
রাজধানীর একটি হোটেলে শুক্রবার শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬-এর প্রথম দিনের আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) তাদের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সম্মেলনের প্রথম পর্বে মাহ্ফুজ আনাম বলেন, অতীতের সরকারগুলোর পতনের অন্যতম কারণ ছিল স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বিকশিত হতে না দেওয়া। স্বাধীন গণমাধ্যম সরকারকে প্রশ্ন করেছে, জবাবদিহির আওতায় এনেছে এবং অনিয়ম তুলে ধরেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম আশা প্রকাশ করেন, নতুন সরকার অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার গুরুত্ব অনুধাবন করবে। তিনি বলেন, “সরকারের নিজের সাফল্যের জন্যও স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রয়োজন।”
পাকিস্তানের সংবাদপত্র ডন-এর সম্পাদক জাফর আব্বাস বলেন, সাংবাদিকতা যদি অনুসন্ধানের বদলে মুনাফার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে এর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। তিনি “সেলফ-সেন্সরশিপ”-কে প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেন।
কানাডার টরন্টো স্টার-এর সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাই একটি সংবাদমাধ্যমকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। সাংবাদিকদের হয়রানি থেকে রক্ষায় মালিক ও ব্যবস্থাপকদের এগিয়ে আসার আহ্বানও জানান তিনি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেশের কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশ্যে হামলার ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সম্মেলনের সমাপনী পর্বে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, নিউ মিডিয়া এখন পুরো গণমাধ্যম জগতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবর্তিত বাস্তবতায় সরকারও নতুনভাবে বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, গণমাধ্যম যেন সঠিক তথ্য পায় এবং জনগণের কাছে তা পৌঁছে দিতে পারে, সে জন্য সরকার ও গণমাধ্যমের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশন সঞ্চালনা করেন কুর্রাতুল-আইন-তাহ্মিনা, শাকিল আনোয়ার এবং তানিম আহমেদ।
বার্তাকক্ষে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি বিষয়ক অধিবেশনে কুর্রাতুল-আইন-তাহ্মিনা বলেন, সাংবাদিকতার লক্ষ্য ও আদর্শ বাস্তবায়নে অন্তর্ভুক্তি ও বৈচিত্র নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। সংবাদমাধ্যমে পরিবর্তন আনতে হলে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে বলে মত দেন তিনি।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক, তথ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক জুলিয়ান শের একটি অধিবেশনে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
আলোচকেরা বলেন, বাংলাদেশের অনেক সংবাদমাধ্যমে এখনো নারী, আঞ্চলিক ও সংখ্যালঘু পটভূমির সাংবাদিকদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। নিয়োগ, নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্ব, মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের মতো বিষয় নারী সাংবাদিকদের পেশাগত অগ্রগতিকে প্রভাবিত করছে।
আয়োজকেরা জানান, নতুন গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে দায়িত্বশীল ও জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতার চর্চা জোরদার করাই এই সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে তুলে ধরার প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও কাজ করবে এ আয়োজন।
সম্মেলনের প্রথম দিনের বিভিন্ন অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন শাহেদ মোহাম্মদ আলী, স্বাতী ভট্টাচার্য, নিকোলাস উইকস, সুসান ভায়েজ, এমিলিয়া দিয়াজ-স্ট্রাক, ফাহিম আহমেদ, হাসিবুর রহমান, বদরুদ্দোজা বাবু এবং জায়মা ইসলামসহ দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।


























