সুখী জীবনের মন্ত্র শেখাচ্ছে নিউজিল্যান্ডের মাওরি সংস্কৃতির ‘মানাআকিতাঙ্গা’
কেউ মন খারাপ করে বসে আছেন, পাশে গিয়ে একটু কথা বলা যায়। রাস্তার পাশে কেউ বিপদে পড়লে এগিয়ে গিয়ে সাহায্য করা যায়। বাড়িতে অতিথি এলে এক কাপ চা এগিয়ে দেওয়া যায়। এমনকি ব্যস্ততার মধ্যেও কারও কথা মন দিয়ে শুনলে তার উপকার হতে পারে।
কাজগুলো খুব ছোট। কিন্তু অন্যের মনে এগুলো গভীর ছাপ ফেলতে পারে। মানুষকে আপন করে নিতে পারে। আর অন্যের জন্য কিছু করতে পারার আনন্দ নিজের মনও ভালো করে দেয়।
বিশ্ব সুখী দেশের তালিকায় নিউজিল্যান্ডের অবস্থান ১১তম। দেশটির মাওরি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে এমনই একটি সুন্দর ধারণা রয়েছে, যার নাম ‘মানাআকিতাঙ্গা’। এর অর্থ আতিথেয়তা, দয়া, উদারতা ও অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। এই ধারণায় প্রত্যেক মানুষকে সম্মান করা, তার খোঁজখবর নেওয়া এবং প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অন্যকে গুরুত্ব দেওয়া
মানাআকিতাঙ্গা কেবল কাউকে খাবার দেওয়া বা থাকার জায়গার ব্যবস্থা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সম্মান, সহমর্মিতা এবং অন্যের প্রয়োজন বোঝার চেষ্টা।
ধরা যাক, কোনো বন্ধু নিজের সমস্যার কথা বলছেন। তাকে সঙ্গে সঙ্গে উপদেশ না দিয়ে মন দিয়ে কথাগুলো শোনা যায়। কোনো সহপাঠী পড়া বুঝতে পারছেন না, তাকে একটু বুঝিয়ে দেওয়া যায়। নতুন কেউ অফিসে যোগ দিলে তার সঙ্গে কথা বলে কাজের পরিবেশ সহজ করে দেওয়া যায়।
এমন আচরণে মানুষ বুঝতে পারেন, তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি একা নন, তার পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষও আছেন।
মানাআকিতাঙ্গার ধারণা অনুযায়ী, কখনো কখনো ছোট্ট একটি আন্তরিক আচরণও মানুষের মনে দীর্ঘদিন থেকে যায়। কারও সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়া, অপরিচিত কাউকে হাসিমুখে স্বাগত জানানো কিংবা প্রয়োজনের সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া—এসবের মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গভীর হয়।
অন্যের যত্ন নিলে নিজেরও ভালো লাগে
সুখ বলতে আমরা অনেক সময় ভালো খাবার, নতুন পোশাক, পছন্দের জিনিস কেনা কিংবা কোনো সাফল্য অর্জন করাকে বুঝি। এসব থেকে আনন্দ পাওয়া স্বাভাবিক।
তবে মানাআকিতাঙ্গার শিক্ষা হলো, মানুষের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং অন্যের উপকার করতে পারার মধ্যেও আনন্দ রয়েছে। কাউকে সাহায্য করার পর তার মুখে স্বস্তির হাসি দেখা গেলে নিজেরও ভালো লাগে। কোনো একাকী মানুষের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললে তার নিঃসঙ্গতা কিছুটা কমতে পারে। আবার নিজের দুঃসময়ে অন্য কেউ পাশে দাঁড়ালে মনে হয়, পৃথিবীতে এখনো অনেক আন্তরিক মানুষ আছেন।
সুখের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা। কেবল নিজের আনন্দ খুঁজে বেড়ানোর বদলে অন্যের পাশে থাকা এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলাও জীবনে তৃপ্তি আনতে পারে।
অবশ্য অন্যের জন্য ভালো কিছু করলেই সব সময় নিজের মন ভালো হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, সহযোগিতা করা ও পাশে দাঁড়ানো জীবনকে আরও অর্থবহ করে তুলতে পারে।
প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্ন
মানাআকিতাঙ্গা চর্চার জন্য বিশেষ কোনো দিন বা উপলক্ষের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিনের নানা কাজের মধ্য দিয়েই তা প্রকাশ করা যায়।
গরমের দিনে বাইরে থেকে ফেরা কাউকে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেওয়া যায়। শীতের সকালে অসুস্থ প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া যায়। পরীক্ষার আগে উদ্বিগ্ন বন্ধুকে সাহস দেওয়া যায়। পরিবারের কেউ অসুস্থ থাকলে ঘরের কাজে হাত লাগানো যায়।
এসব কাজের জন্য অনেক টাকা খরচ করার প্রয়োজন নেই। দরকার একটু মনোযোগ, আন্তরিকতা এবং অন্যের প্রয়োজন বোঝার চেষ্টা।
আমাদের চারপাশে অনেক মানুষ আছেন, যাদের জীবনে সামান্য সাহায্যও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বয়স্ক প্রতিবেশীর বাজার করে দেওয়া, কোনো শিশুকে পড়া বুঝিয়ে দেওয়া কিংবা বিপদে পড়া কাউকে সঠিক পথ দেখানো—এসবই যত্নের প্রকাশ।
তবে সাহায্য করার সময় অন্যের সম্মান ও ইচ্ছার প্রতিও খেয়াল রাখা জরুরি। কাউকে সাহায্য করতে গিয়ে তাকে ছোট করা কিংবা তার ব্যক্তিগত বিষয়ে অযথা হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
প্রতিদিনের জীবনে মানাআকিতাঙ্গা চর্চার ১০ উপায়
১. খাবার ভাগ করে খাওয়া: পরিবারের সদস্য, বন্ধু কিংবা অন্য কারও সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়া।
২. হাসিমুখে কথা বলা: আন্তরিক একটি হাসি অন্যের মন ভালো করে দিতে পারে।
৩. মন দিয়ে কথা শোনা: কেউ কথা বলার সময় মনোযোগ দিয়ে শোনা। এতে তিনি বুঝতে পারবেন, তার কথার গুরুত্ব রয়েছে।
৪. উদার হওয়া: প্রয়োজনের সময় নিজের সময়, শ্রম কিংবা সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করা।
৫. অন্যকে স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়া: নিজের বাড়ি বা আশপাশের পরিবেশে অন্যদের স্বাগত জানানো এবং তাদের সুবিধার দিকে খেয়াল রাখা।
৬. প্রতিদানের আশা না করে সাহায্য করা: কোনো লাভের প্রত্যাশা ছাড়াই ভালো কাজ করা।
৭. অপরিচিতের প্রতিও সদয় হওয়া: ছোট্ট একটি ভালো কাজও অপরিচিত কারও জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
৮. নিজের এলাকার মানুষের পাশে থাকা: স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে অংশ নেওয়া কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয় মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা।
৯. অন্যের কষ্ট বোঝার চেষ্টা করা: সবাই কোনো না কোনো সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে পারেন। তাদের পরিস্থিতি বোঝা এবং সহমর্মিতা দেখানো জরুরি।
১০. অন্যের ভালোবাসা গ্রহণ করা: প্রয়োজনের সময় অন্যের সাহায্য ও যত্ন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করা। কারণ, সবারই কখনো না কখনো অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়।
উদারতায় সুন্দর হয় জীবন
আমরা অনেক সময় ভাবি, সমাজের জন্য ভালো কিছু করতে হলে বড় উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু মানাআকিতাঙ্গা শেখায়, সমাজ গড়ে ওঠে মানুষের প্রতিদিনের আচরণের মধ্য দিয়েই। প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া, বন্ধুর বিপদে পাশে থাকা কিংবা অপরিচিত কারও সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করার মধ্য দিয়েও পারস্পরিক আস্থা বাড়ে।
ব্যস্ত জীবনে মানুষে মানুষে দূরত্ব তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এমন সময়ে একটু সময় দেওয়া, মন দিয়ে কথা শোনা কিংবা প্রয়োজনের মুহূর্তে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া মানুষকে কাছাকাছি আনতে পারে।
মানাআকিতাঙ্গার মূল শিক্ষা হলো, অন্যের প্রতি যত্ন দেখানোর জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। ছোট ছোট কাজের মধ্য দিয়েই এই মূল্যবোধ চর্চা করা সম্ভব।
সুখ সব সময় নিজের জন্য কিছু পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কখনো কখনো অন্যের জীবনে সামান্য স্বস্তি এনে দেওয়ার মধ্যেও সুখ খুঁজে পাওয়া যায়।


























