জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর ভাষণ, ওয়াকআউট করলেন কয়েক ডজন প্রতিনিধি
ইরান, গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে সমর্থন করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বৃহস্পতিবার তাঁর ভাষণের সময় প্রতিবাদ জানিয়ে কয়েক ডজন প্রতিনিধি অধিবেশনকক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিনিধিদের ওয়াকআউটের পরও ভাষণ চালিয়ে যান নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, ইসরায়েল লড়াই চালিয়ে যাবে এবং ‘জিতবে’। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই।’
হল ত্যাগ করা প্রতিনিধিদের উদ্দেশে নেতানিয়াহু বলেন, ‘যদি আরও কোনো নৈতিক কাপুরুষ হলে থেকে থাকেন, দয়া করে এখন বেরিয়ে যান।’ তাঁর বক্তব্যের সময় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের হলের বড় একটি অংশ খালি হয়ে যায়।
গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে—এমন অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন নেতানিয়াহু। ইরানে ইসরায়েলি হামলার সিদ্ধান্তকে তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়ে নেওয়া ‘সবচেয়ে সহজ সিদ্ধান্তগুলোর একটি’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভাষণে ইসরায়েলের সমালোচনাকারী বিভিন্ন দেশ ও নেতারও সমালোচনা করেন নেতানিয়াহু। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে ‘স্বৈরশাসক’ আখ্যা দিয়ে হামাসকে সমর্থনের অভিযোগ করেন তিনি।
এর আগে মঙ্গলবার জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে এরদোয়ান গাজা ও পশ্চিম তীরের মানুষের ওপর চলমান পরিস্থিতিকে ‘মানবতার বিবেকের জন্য গভীরভাবে অপমানজনক’ বলে মন্তব্য করেন। নেতানিয়াহুর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তুরস্কের প্রেসিডেন্টের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক বুরহানেত্তিন দুরান বলেন, জাতিসংঘের মঞ্চ ব্যবহার করে তুরস্ক ও এরদোয়ানের বিরুদ্ধে ‘ভিত্তিহীন অভিযোগ’ তোলা সংস্থাটির শান্তি, আইন ও সংলাপের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকেও সমালোচনা করেন নেতানিয়াহু। তিনি দাবি করেন, মামদানি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নিউইয়র্কের অনেক ইহুদি নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না। তবে মামদানির কার্যালয় পাল্টা অভিযোগ করে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড আড়াল করতে নেতানিয়াহু তাঁর ভাষণে ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’ পুনরাবৃত্তি করেছেন।
ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও প্রশংসা করেন নেতানিয়াহু। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি ট্রাম্পের ‘সাহসী নেতৃত্বের’ প্রশংসা করেন। এর আগে নেতানিয়াহু জানিয়েছিলেন, জাতিসংঘে তিনি ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে বক্তব্য রাখবেন এবং সমালোচকদের জবাব দেবেন।
এর কয়েক ঘণ্টা আগে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জাতিসংঘে বক্তব্য দেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। তিনি বলেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণসহ দেশটির নীতিগুলো ফিলিস্তিনি জনগণের নিজ ভূখণ্ডে অস্তিত্ব ও ভবিষ্যতের জন্য হুমকি তৈরি করছে।
আব্বাস বলেন, গাজায় ফিলিস্তিনিরা হত্যা, ধ্বংস, অনাহার ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, সেখানে ‘গণহত্যামূলক যুদ্ধ’ চলছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশের ভিসা না দেওয়ায় ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে তিনি জাতিসংঘে বক্তব্য দেন।
তিনি আরও বলেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনকে দুটি পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার এ সমাধান আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত।
এদিকে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নিউইয়র্কে বিক্ষোভও হয়েছে। এ সময় কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে অস্কারজয়ী অভিনেত্রী সুসান সারান্ডন এবং ‘হ্যাকস’ সিরিজের এমি পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী হান্না আইনবাইন্ডারও ছিলেন। নিউইয়র্ক পুলিশ জানিয়েছে, একটি অননুমোদিত বিক্ষোভে সড়কের মোড় অবরুদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে তারা সেখানে যায়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় স্থল অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। ইসরায়েলি তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত এবং ২৫১ জন জিম্মি হন।
গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এরপর থেকে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ৭৩ হাজার ৯২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল অবশ্য গাজায় গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। দেশটির দাবি, হামাসের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অংশ হিসেবেই তারা সামরিক অভিযান চালাচ্ছে।


























