জাতিসংঘে তারেক রহমানের ভাষণ: শান্তি, ফিলিস্তিন ও রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের অবস্থান
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেলে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দেওয়া প্রায় ৪০ মিনিটের বাংলাভাষণের শুরুতেই তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
এ ভাষণের মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দিলেন তারেক রহমান। এর আগে তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন।
ভাষণে তারেক রহমান বিশ্বশান্তি, কূটনীতি, ফিলিস্তিন, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, নিরস্ত্রীকরণ ও বহুপাক্ষিকতার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় বিশ্ব, এমন একটি মানবিক বিশ্ব সমাজ, যেখানে মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা।’ বাংলাদেশের কাছে জাতিসংঘকে এমন একটি সমঝোতামূলক বিশ্ব প্রতিষ্ঠার কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চান বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন
স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন রয়েছে।
একই সঙ্গে সামরিক ব্যয় বাড়িয়ে উন্নয়ন বাজেট সংকুচিত করার প্রবণতাকে বিশ্বশান্তির অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করে তিনি পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহায়তা
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের অন্যতম বড় আন্তর্জাতিক উদ্বেগ হিসেবে তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়াই এ সংকটের একমাত্র সমাধান বলে তিনি মন্তব্য করেন। এ জন্য জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সহযোগিতা চান তিনি।
জলবায়ু ন্যায়বিচারের আহ্বান
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ জোরদারের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান সামান্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি, ক্লিন ও সৌর জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরেন তিনি।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার কথা
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গও ভাষণে তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর বাংলাদেশ আবার গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
দেশ পুনর্গঠনে সরকারের ‘৩-আর’ কৌশল—Recovery, Restoration ও Reconstruction—এর কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ কৌশলের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের কাজ চলছে। একই সঙ্গে নিরাপদ ও স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানোর কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’
তরুণদের কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশুদের বিকাশ এবং সামাজিক সুরক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে এবং প্রতিটি শিশু নিজের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে।
তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।’
ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যতে এসব উদ্যোগ সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান।
এলডিসি উত্তরণে সহযোগিতা চাওয়া
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এ উত্তরণ টেকসই করতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ধারাবাহিক সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে নিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক সহায়তা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতাই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার অন্যতম ভিত্তি।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের দ্রুত অগ্রগতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তির সুযোগ সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বর্তমান ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে রূপ না নেয়।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিকাশের সুফল ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
বহুপাক্ষিকতার ওপর জোর
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ‘আস্থা পুনরুদ্ধার ও রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে এ প্রতিপাদ্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতার নীতিতে অটল থাকবে জানিয়ে তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অবদানের কথা তুলে ধরেন। অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে আরও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সহযোগিতারও আহ্বান জানান তিনি।
ভাষণের শেষে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা এবং জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।























