জ্বালানি তেলের দাম বাড়তেই চড়া নিত্যপণ্যের বাজার
জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ার পর প্রথম শুক্রবারেই এর প্রভাব পড়েছে রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে। বেড়েছে প্রায় সব ধরনের সবজি, মাছ, ডিম, আটা-ময়দা, দুধ ও ফলের দাম। তবে মাংস, মুরগি ও চালের দামে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। এতে বাড়তি দামে চাপে পড়েছেন ক্রেতারা।
শুক্রবার সকালে রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
গত সপ্তাহের তুলনায় খুচরা বাজারে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পাইকারি ও খুচরা বাজারে।
মিরপুর-১ নম্বর কাঁচাবাজারে লম্বা বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে এ বেগুনের দাম ছিল ৯০ থেকে ১০০ টাকা। করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা কিছুদিন আগেও ৬০ থেকে ৮০ টাকা ছিল। ছোট পটল ও ঢ্যাঁড়শের দাম বেড়ে ৬০ থেকে ৮০ টাকা হয়েছে। সপ্তাহখানেক আগে এসব সবজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।
এ ছাড়া ঝিঙা, ধুন্দলসহ বিভিন্ন সবজির দাম ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে কাঁচা পেঁপে ৩০ টাকা এবং কাঁচামরিচ আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে।
সবজি বিক্রেতা রাসেল হোসেন বলেন, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজারেও সবজির দাম বেড়েছে। আরেক ব্যবসায়ী মিজান বলেন, যশোর থেকে কারওয়ান বাজারে বেগুন আনতে আগে মাঝারি আকারের ট্রাকে ভাড়া লাগত প্রায় ১৮ হাজার টাকা। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর তা বেড়ে ২১ হাজার টাকা হয়েছে। এতে কারওয়ান বাজারেই বেগুনের দাম ১০০ টাকার ওপরে উঠেছে।
জ্বালানির বাড়তি খরচে মাছ পরিবহনেও ব্যয় বেড়েছে। বিক্রেতাদের হিসাবে, প্রতি ট্রাকে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। এর প্রভাবে মাছের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ইলিশের দামও বেড়েছে।
তবে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম গত সপ্তাহের মতোই রয়েছে। ব্রয়লার ১৮০ এবং সোনালি মুরগি ৩২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। লেয়ার মুরগির দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ৩৫০ টাকা হয়েছে। ব্রয়লার সাদা ডিম ১৪০ টাকা ডজন দরে বিক্রি হলেও ব্রাউন ডিমের দাম বেড়ে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে।
গরু ও খাসির মাংসের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। গরুর মাংস ৮০০ এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চালের দামেও এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বড় প্রভাব দেখা যায়নি।
এদিকে পাস্তুরিত তরল দুধের দামও বেড়েছে। কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি প্রতি লিটার দুধের দাম ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এর আগে সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটাও লিটারপ্রতি ১০ টাকা দাম বাড়ায়।
আটা ও ময়দার দামও বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্যাকেটজাত আটা ৭০ টাকা এবং ময়দা ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সপ্তাহখানেক আগে এসব পণ্যের দাম ছিল যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ টাকা। খোলা আটা ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং ময়দা ৬৫ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাঁচ-ছয় দিনের ব্যবধানে খোলা আটা ও ময়দার দামও কেজিতে প্রায় ৫ টাকা বেড়েছে।
মহাখালী কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী বিকাশ বণিক বলেন, এক-দেড় মাস আগে আটা-ময়দার দাম বেড়েছিল। এখন আবার দাম বাড়ানো হয়েছে। নতুন করে বাজারে আসা দুই কেজির প্যাকেটজাত আটার খুচরা মূল্য ১৪০ টাকা এবং ময়দার ১৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফলের বাজারেও বাড়তি দামের প্রভাব পড়েছে। প্রতি কেজি মালটা ও কমলা ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং আপেল ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। লাল আঙুরের দাম কেজিতে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। ব্যবসায়ীরা ফলের দাম বাড়ার পেছনেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করছেন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পণ্যের দামও বাড়বে—বিষয়টি এমন নয়। জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে কিলোমিটারপ্রতি পরিবহন ভাড়া কতটা বাড়া যৌক্তিক এবং বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ে এর প্রভাব কতটা পড়বে, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের দ্রুত এ বিষয়ে বিশ্লেষণ দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে গ্রাম থেকে ঢাকায় সবজি পরিবহনে কতটুকু বাড়তি খরচ হবে, সে বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত থাকা দরকার। এর ভিত্তিতে কৃষি, খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বাজার তদারক করতে পারে। এতে ব্যবসায়ীরাও অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় বাজারে পণ্যের দামে সামান্য যে প্রভাব পড়ার কথা, কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে বলে তারা জানতে পারছেন। তবে এর সুযোগ ব্যবসায়ীদের নিতে দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, পরিবহন ভাড়া কেজিতে সামান্য বাড়ার অজুহাতে পণ্যের দাম দ্বিগুণ বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করার সুযোগ দেওয়া হবে না। প্রতিদিন বাজার তদারক করা হচ্ছে। পরিবহন ভাড়া কত বাড়ছে এবং পণ্যের দাম কতটা বাড়ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে নজরদারি আরও কঠোর করা হবে।


























