ঢাকা ০১:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo উচ্ছেদে থামছে না ফুটপাত দখল, স্থায়ী সমাধানে পরিকল্পনার তাগিদ Logo অননুমোদিত গুদামে শুল্কমুক্ত মদ: টস বন্ডের চার ওয়্যারহাউস সিলগালা Logo আশুলিয়ায় দুই শ্রমিক দল নেতার বাসায় হামলা, আহত ৬ Logo বিডিনিউজের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী মারা গেছেন Logo আখতারুজ্জামানের গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়ে মুক্তি দাবি শফিকুর রহমানের Logo দুই দফা প্রাণঘাতী ইনজেকশনেও বেঁচে গেলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী Logo দুর্গাপূজায় টানা ৯ দিনের ছুটি পাচ্ছে স্কুলশিক্ষার্থীরা Logo বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলার মামলায় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার Logo চাঁদা না পেয়ে মারধর ও গুলিবর্ষণ: যুবদলের সাবেক নেতার ৪ দিনের রিমান্ড Logo মুক্তির আগেই ‘দৃশ্যম থ্রি’র অগ্রিম টিকিট বিক্রিতে রেকর্ড

উচ্ছেদে থামছে না ফুটপাত দখল, স্থায়ী সমাধানে পরিকল্পনার তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক

যানজট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে এমনিতেই বিপর্যস্ত ঢাকা। এর সঙ্গে ফুটপাত ও সড়ক দখল নগরজীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে। দখলমুক্ত করতে নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও উচ্ছেদের পর আবারও ফুটপাত দখলের চিত্র দেখা যাচ্ছে। নগরবিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, সমস্যার স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন পরিকল্পিত নগরায়ণ, বিকেন্দ্রীকরণ, বিকল্প কর্মসংস্থান ও হকার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন।

জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টাস ২০২৫’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঢাকার জনসংখ্যা আনুমানিক ৩ কোটি ৬৬ লাখ। ২০৫০ সালে তা বেড়ে ৫ কোটি ২১ লাখে পৌঁছাতে পারে। বিপুল এই জনসংখ্যার চাপ সামাল দেওয়ার মতো পরিবহনব্যবস্থা, সড়ক, ফুটপাত ও নাগরিক অবকাঠামো নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রতিনিয়ত ঢাকামুখী হচ্ছে মানুষ। অথচ সেই অনুপাতে নগরসেবা ও অবকাঠামোর উন্নয়ন না হওয়ায় যানজট, আবাসনসংকট এবং জনপরিসর দখলের সমস্যা ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।

ফুটপাত দখলে বাড়ছে দুর্ভোগ

রাজধানীর গুলিস্তান, জিরো পয়েন্ট, গোলাপ শাহ মাজার থেকে সদরঘাট পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত ও সড়কের অংশজুড়ে বসছে অস্থায়ী দোকান। ফলে পথচারীদের অনেক সময় মূল সড়কে নেমে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকির পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে যান চলাচলও।

দখলমুক্ত করতে গত বৃহস্পতিবার ধলপুর এলাকায় অভিযান চালায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। প্রশাসকের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে বিভিন্ন দোকান উচ্ছেদ করা হয়। তবে হকারদের অভিযোগ, বিকল্প ব্যবসাস্থল নিশ্চিত না করে উচ্ছেদ করা হলে তাদের জীবিকা বন্ধ হয়ে যায়।

এক হকার বলেন, “আমাদেরও সংসার আছে, বউ-বাচ্চা আছে। নিজেদের চলার তাগিদেই বসি। উচ্ছেদ করে দিলে আবারও বসতে হয়।”

অন্য এক হকার বলেন, “অভিযান চালিয়ে তারা চলে গেলে আমরা আবার বসি। আমরাও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে বাঁচতে চাই না। আমাদের জন্য টেকসই একটা ব্যবস্থা করে দিতে হবে।”

অভিযানের এক সপ্তাহ না পেরোতেই জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় আবারও হকারদের ফিরে আসার চিত্র দেখা গেছে। গোলাপ শাহ মাজার থেকে স্টেডিয়াম মার্কেট এলাকাতেও ফুটপাত দখলের পুরোনো চিত্র ফিরেছে।

শুধু উচ্ছেদে সমাধান নয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আখতার মাহমুদ বলেন, গ্রাম ও ছোট শহরের সঙ্গে রাজধানীর কর্মসংস্থান ও সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য থাকলে মানুষের ঢাকামুখী প্রবণতা কমবে না। বিকেন্দ্রীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং হকারদের পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ অভিযান দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।

ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খানও হকার ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতিমালার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, বিকল্প ব্যবসাস্থল, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং ফুটপাত দখলের সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে পুনর্দখল ঠেকানো কঠিন।

এদিকে ডিএসসিসির প্রশাসক আব্দুস সালাম জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সড়ক দখলমুক্ত রাখার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ বসলে পুনরায় উচ্ছেদের পাশাপাশি মামলা করা হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। নিবন্ধিত হকার ছাড়া রাজধানীতে কাউকে ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।

নীতিমালার বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ

হকার ব্যবস্থাপনায় সরকার ২০২৬ সালে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এতে হকারদের নিবন্ধন, নির্ধারিত স্থানে ব্যবসা, ছুটির দিনের বাজার ও রাতের বাজার চালুর মতো ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নির্ধারিত স্থানে দোকান বসানোর পরও পথচারীদের চলাচলের জন্য অন্তত ৫ থেকে ৬ ফুট জায়গা খালি রাখার নির্দেশনা রয়েছে।

তবে নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, নির্ধারিত স্থানে পর্যাপ্ত ক্রেতা নিশ্চিত করা, নিয়মিত তদারকি এবং দখলদারির সঙ্গে যুক্ত মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

রাজধানীকে বাসযোগ্য রাখতে ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করার পাশাপাশি জীবিকার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের জন্য নিয়মতান্ত্রিক বিকল্প ব্যবস্থাও জরুরি। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান বাড়ানো, নগরসেবা বিকেন্দ্রীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় উচ্ছেদ অভিযান চললেও হকারদের পুনরায় ফিরে আসা এবং নগরবাসীর দুর্ভোগের চক্র অব্যাহত থাকবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ১০:৩০:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
৪৫১৩ বার পড়া হয়েছে

উচ্ছেদে থামছে না ফুটপাত দখল, স্থায়ী সমাধানে পরিকল্পনার তাগিদ

আপডেট সময় ১০:৩০:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬

যানজট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে এমনিতেই বিপর্যস্ত ঢাকা। এর সঙ্গে ফুটপাত ও সড়ক দখল নগরজীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে। দখলমুক্ত করতে নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও উচ্ছেদের পর আবারও ফুটপাত দখলের চিত্র দেখা যাচ্ছে। নগরবিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, সমস্যার স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন পরিকল্পিত নগরায়ণ, বিকেন্দ্রীকরণ, বিকল্প কর্মসংস্থান ও হকার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন।

জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টাস ২০২৫’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঢাকার জনসংখ্যা আনুমানিক ৩ কোটি ৬৬ লাখ। ২০৫০ সালে তা বেড়ে ৫ কোটি ২১ লাখে পৌঁছাতে পারে। বিপুল এই জনসংখ্যার চাপ সামাল দেওয়ার মতো পরিবহনব্যবস্থা, সড়ক, ফুটপাত ও নাগরিক অবকাঠামো নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রতিনিয়ত ঢাকামুখী হচ্ছে মানুষ। অথচ সেই অনুপাতে নগরসেবা ও অবকাঠামোর উন্নয়ন না হওয়ায় যানজট, আবাসনসংকট এবং জনপরিসর দখলের সমস্যা ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।

ফুটপাত দখলে বাড়ছে দুর্ভোগ

রাজধানীর গুলিস্তান, জিরো পয়েন্ট, গোলাপ শাহ মাজার থেকে সদরঘাট পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত ও সড়কের অংশজুড়ে বসছে অস্থায়ী দোকান। ফলে পথচারীদের অনেক সময় মূল সড়কে নেমে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকির পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে যান চলাচলও।

দখলমুক্ত করতে গত বৃহস্পতিবার ধলপুর এলাকায় অভিযান চালায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। প্রশাসকের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে বিভিন্ন দোকান উচ্ছেদ করা হয়। তবে হকারদের অভিযোগ, বিকল্প ব্যবসাস্থল নিশ্চিত না করে উচ্ছেদ করা হলে তাদের জীবিকা বন্ধ হয়ে যায়।

এক হকার বলেন, “আমাদেরও সংসার আছে, বউ-বাচ্চা আছে। নিজেদের চলার তাগিদেই বসি। উচ্ছেদ করে দিলে আবারও বসতে হয়।”

অন্য এক হকার বলেন, “অভিযান চালিয়ে তারা চলে গেলে আমরা আবার বসি। আমরাও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে বাঁচতে চাই না। আমাদের জন্য টেকসই একটা ব্যবস্থা করে দিতে হবে।”

অভিযানের এক সপ্তাহ না পেরোতেই জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় আবারও হকারদের ফিরে আসার চিত্র দেখা গেছে। গোলাপ শাহ মাজার থেকে স্টেডিয়াম মার্কেট এলাকাতেও ফুটপাত দখলের পুরোনো চিত্র ফিরেছে।

শুধু উচ্ছেদে সমাধান নয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আখতার মাহমুদ বলেন, গ্রাম ও ছোট শহরের সঙ্গে রাজধানীর কর্মসংস্থান ও সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য থাকলে মানুষের ঢাকামুখী প্রবণতা কমবে না। বিকেন্দ্রীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং হকারদের পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ অভিযান দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।

ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খানও হকার ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতিমালার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, বিকল্প ব্যবসাস্থল, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং ফুটপাত দখলের সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে পুনর্দখল ঠেকানো কঠিন।

এদিকে ডিএসসিসির প্রশাসক আব্দুস সালাম জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সড়ক দখলমুক্ত রাখার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ বসলে পুনরায় উচ্ছেদের পাশাপাশি মামলা করা হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। নিবন্ধিত হকার ছাড়া রাজধানীতে কাউকে ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।

নীতিমালার বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ

হকার ব্যবস্থাপনায় সরকার ২০২৬ সালে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এতে হকারদের নিবন্ধন, নির্ধারিত স্থানে ব্যবসা, ছুটির দিনের বাজার ও রাতের বাজার চালুর মতো ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নির্ধারিত স্থানে দোকান বসানোর পরও পথচারীদের চলাচলের জন্য অন্তত ৫ থেকে ৬ ফুট জায়গা খালি রাখার নির্দেশনা রয়েছে।

তবে নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, নির্ধারিত স্থানে পর্যাপ্ত ক্রেতা নিশ্চিত করা, নিয়মিত তদারকি এবং দখলদারির সঙ্গে যুক্ত মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

রাজধানীকে বাসযোগ্য রাখতে ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করার পাশাপাশি জীবিকার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের জন্য নিয়মতান্ত্রিক বিকল্প ব্যবস্থাও জরুরি। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান বাড়ানো, নগরসেবা বিকেন্দ্রীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় উচ্ছেদ অভিযান চললেও হকারদের পুনরায় ফিরে আসা এবং নগরবাসীর দুর্ভোগের চক্র অব্যাহত থাকবে।