অটোরিকশা বন্ধ নয়, ডিজিটাল নিবন্ধন ও ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে ডিজিটাল নিবন্ধন, কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার আওতায় এনে শৃঙ্খলায় ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সোমবার জাতীয় সংসদে ৭১ বিধির আওতায় সরকারি দলের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় সংসদে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অটোরিকশা ব্যবস্থাপনায় সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ইতোমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। এর আওতায় প্রতিটি অটোরিকশাকে ডিজিটাল নিবন্ধনের মাধ্যমে কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। ফলে একটি নম্বরের অধীনে অবৈধভাবে একাধিক অটোরিকশা পরিচালনার সুযোগ থাকবে না।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রণীত নীতিমালায় অটোরিকশা চালকদের কর্মসংস্থান যাতে ব্যাহত না হয়, সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্যের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এসব যানকে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।
অটোরিকশায় ব্যবহৃত ক্ষতিকর লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি বাদ দিয়ে পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারের ওপরও নীতিমালায় কঠোর শর্ত রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার রয়েছে। এসব যান দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে। অথচ বৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে মাত্র প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। শুধু ঢাকায় প্রায় ৪৮ হাজার অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে সরকার প্রতিবছর প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডিএমপি, ডেসকো ও ডিপিডিসির যৌথ অভিযানে এসব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে।
গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ তিন চাকার বৈদ্যুতিক যান গ্রামীণ ও নগর পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কম খরচে যাতায়াতের সুযোগের পাশাপাশি চালক, গ্যারেজ শ্রমিক, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী ও চার্জিং সেবাদাতাসহ বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। তবে এসব যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশের সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জড়িত ছিল।
এর আগে নোটিশে রেহানা আক্তার রানু বলেন, রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে চালু থাকা ৫০টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ট্রাফিক ক্যামেরার কারণে লালবাতি অমান্য, লেন পরিবর্তন ও অতিরিক্ত গতিসহ বিভিন্ন অনিয়ম অনেকাংশে কমেছে। তবে নম্বর প্লেট না থাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ম শনাক্ত হলেও জরিমানা বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, কম ভাড়া ও সহজলভ্যতার কারণে অটোরিকশা সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়। তাই এসব যান পুরোপুরি বন্ধ না করে নম্বর প্লেট, চালকদের প্রশিক্ষণ ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের আওতায় এনে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
সম্পূরক প্রশ্নে রেহানা আক্তার রানু বলেন, তিনি অটোরিকশা নিষিদ্ধ করার কথা বলেননি; বরং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে এগুলো নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন। অটোরিকশা জব্দ ও ডাম্পিংয়ের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলের ব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলা, বিআরটিএ নিবন্ধন এবং এলাকাভিত্তিক রিকশা চলাচল ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন তিনি।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধান সড়কে অটোরিকশা চলাচল বন্ধে ডিএমপি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। পাশাপাশি রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআই প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হচ্ছে। ১৭টি সিগন্যালে ৫০টি এআই ক্যামেরা থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়ায় তেজগাঁও ও রমনা বিভাগে আরও ২০০টি এআই ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে এ ব্যবস্থা পুরো রাজধানীতে সম্প্রসারণ করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার অটোরিকশা বন্ধের পরিবর্তে এটিকে নিবন্ধিত, ডিজিটাল ও শৃঙ্খলিত ব্যবস্থার মধ্যে আনতে চায়। জাতীয় স্বার্থ, সড়ক নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সংশ্লিষ্ট মানুষের কর্মসংস্থান—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নীতিমালার পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হবে।






















