অনুমোদন পেল বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প
ঢাকা, ১৩ মে : প্রায় ছয় দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প-এর প্রথম ধাপের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা।
বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন তারেক রহমান।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানির ঘাটতি মোকাবিলা, নদী ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন নিশ্চিত করা। রাজবাড়ীর পাংশায় নির্মিতব্য ব্যারাজে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ইছামতি-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদীতে নিয়ন্ত্রিত পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে গোদাগাড়ী পাম্প হাউস, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলার প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া প্রকল্পের মাধ্যমে ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যারাজের ওপর সড়ক, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের মাধ্যমে এটিকে বহুমুখী করিডর হিসেবেও ব্যবহার করা হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এর ফলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন ধান এবং ২ লাখ ৩৪ হাজার টন মাছ উৎপাদন সম্ভব হবে। পাশাপাশি বাস্তবায়নকালে প্রায় ১২ কোটি ২৫ লাখ কর্মদিবসের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যেখানে প্রায় ৪৭ হাজার ৯৫০ জন শ্রমিক সরাসরি কাজের সুযোগ পাবেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৯ লাখ ২৭ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলেও আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ৩ হাজার ৪৫০ একর জমিতে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার পরিবারের জন্য সাতটি উপগ্রহ শহর ও আধুনিক গ্রামীণ টাউনশিপ নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি থেকে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যেতে পারে এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে প্রায় শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ অবদান রাখতে পারে। একই সঙ্গে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততার আগ্রাসন কমিয়ে সুন্দরবন-সহ উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; বরং দেশের পানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়নের অন্যতম কেন্দ্রীয় সমাধান হতে পারে।
উল্লেখ্য, ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর থেকে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ও খালে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায় এবং কৃষি, মৎস্য, বনজ সম্পদ ও নৌপথে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে এ সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।






















