বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্ট-টাইম জব ও ক্যারিয়ার সেন্টার চালুর তাগিদ দিলেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমীন
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য পার্ট-টাইম চাকরির সুযোগ সৃষ্টি এবং কার্যকর ক্যারিয়ার সেন্টার চালুর তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমীন।
শুক্রবার সাভারে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) আয়োজিত দুই দিনব্যাপী জাতীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সংলাপে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ তাগিদ দেন।
‘ভাইস চ্যান্সেলরস ডায়ালগ: শেপিং দ্য ফিউচার অব হায়ার এডুকেশন’ শীর্ষক সংলাপে মাহ্দী আমীন বলেন, বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আদলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষার্থীদের জন্য পার্ট-টাইম জবের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় কি না, তা নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান সহজ করতে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর ক্যারিয়ার সেন্টার গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এসব সেন্টারে শিক্ষার্থীদের মানসম্মত জীবনবৃত্তান্ত তৈরি, চাকরির সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি এবং পেশাগত দিকনির্দেশনা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত চাকরির মেলার আয়োজন করা যেতে পারে। দেশি-বিদেশি ও জাতীয় পর্যায়ের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিনামূল্যে চাকরির মেলা আয়োজন করতে প্রস্তুত। এর জন্য অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন নেই; শুধু সুযোগ ও সংযোগ তৈরি করে দিলেই নিয়োগকর্তা ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটানো সম্ভব।
মাহ্দী আমীন বলেন, জীবনবৃত্তান্ত তৈরি থেকে শুরু করে সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি—এসবও আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বের অংশ।
সংলাপে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ জন উপাচার্য, নীতিনির্ধারক, জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, দেশি-বিদেশি শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ এবং ইউজিসি ও হিট প্রকল্পের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
ব্রেইন ড্রেন রোধে ব্রেইন সার্কুলেশনের উদ্যোগ
ব্রেইন ড্রেন বা মেধাপাচার রোধ করে তা ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তরের পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি গবেষক, শিক্ষাবিদ ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অতিথি শিক্ষক বা গবেষণাবৃত্তির মাধ্যমে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিদেশে থাকা এসব শিক্ষাবিদ ও গবেষককে বছরে কয়েক মাস দেশে এসে পাঠদান ও গবেষণায় অবদান রাখার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ইউজিসির সঙ্গে নীতিগত আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ল্যাবরেটরি, জার্নাল ও গবেষণা সহায়তার মতো প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি দূর করে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর অর্জনে বৈশ্বিক অংশীদারত্ব জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেন মাহ্দী আমীন। পাশাপাশি উন্নত বিশ্বের আদলে ‘সামার স্কুল’ চালু, দূরশিক্ষণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং দেশ-বিদেশের মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সহজ ক্রেডিট ট্রান্সফারের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
দক্ষতা ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা
মাহ্দী আমীন বলেন, শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ ও সুনাগরিকের গুণাবলি বিকাশের পাশাপাশি তাদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করে গড়ে তোলা।
তিনি বলেন, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সনদ অর্জন নয়, নৈতিক মূল্যবোধ ও বাস্তব দক্ষতার সমন্বয়ে শিক্ষাব্যবস্থা সাজানো হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি সব খাতে শিক্ষার্থীরা যাতে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারেন এবং নিজেরাই নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হবে।
শিক্ষার্থীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্বল্পমেয়াদি ‘মাইক্রো-কোর্স’ চালুর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। ডিজিটাল সাক্ষরতা, ফ্রিল্যান্সিং ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণের মতো তিন মাসের ব্যবহারিক ও ঐচ্ছিক কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান।
তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন মাহ্দী আমীন। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পর্যায়ক্রমে ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নিতে পারে।
আগামী পাঁচ বছরে তরুণদের জন্য অন্তত দুই থেকে তিনটি বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। বিদেশে উচ্চশিক্ষা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিপিও খাতে তরুণদের সুযোগ বাড়াতে ভাষাগত দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শিক্ষা, সংস্কৃতি ও খেলাধুলায় গুরুত্ব
শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সংস্কৃতি এবং যুব ও ক্রীড়া কার্যক্রমের নিবিড় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সারা বছর বিতর্ক, বিজ্ঞান ক্লাব, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে বিএনসিসি, স্কাউটস ও গার্ল গাইডের মতো সহশিক্ষা কার্যক্রম সক্রিয় রাখার পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও রাজধানীর শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার সুযোগ পাবে।
মাহ্দী আমীন বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’। এই তরুণ সমাজকে দক্ষ, কর্মক্ষম ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলাই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
তিনি বলেন, তরুণদের ভাগ্যোন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম। দক্ষ ও কর্মক্ষম তরুণ সমাজ গড়ে তোলার ওপরই দেশের ভবিষ্যৎ ও অগ্রগতির অনেকাংশ নির্ভর করছে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদসহ সংশ্লিষ্টরা।


























