কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ আগুন: ছাই হয়ে গেল হাজারো ঘর ও স্বপ্ন
ভয়াবহ আগুনে পুড়ে গেছে হাজার খানেক ঘর। ছাই হয়েছে তিলে তিলে জমানো সঞ্চয়, বিছানা-বালিশ এমন কী আদরের পোষা প্রাণীটিও। চারদিকে পোড়া কয়লার কালো রং। যেন এক ধ্বংসস্তূপ। সবকিছু হারিয়ে দিশেহারা বস্তিবাসী। রাজধানীর মহাখালীর এই কড়াইল বস্তিতেই গতকাল বিকেলে আগুন লাগে। আর সেই আগুনে পোড়া জিনিসপত্র নিয়ে বিলোপ করছেন অনেকে। বুধবার সকালে এমন চিত্রই দেখা গেছে। যদিও সাড়ে ১৬ ঘণ্টা পর আগুন পুরো নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু ততক্ষণে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে বস্তিবাসীর স্বপ্ন, জমানো সম্পদও। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর অনেকে এই পোড়াস্তুপের মধ্যেই রাত কাটিয়েছেন। টানিয়েছেন মশারি। কিন্তু উপরে খোলা আকাশ চারপাশে পোড়া গন্ধ।
সেখানে দেখা গেল নাসরিন আক্তার নামের একজনকে। দশ বছর ধরে কড়াইল বস্তিতে থাকেন। গতকালের আগুনে সব পুড়ে গেছে তার। তরিঘরি করে ঘর থেকে দুই বাচ্চা ছাড়া আর কিছুই নিয়ে বের হতে পারেননি। ঘরে ৫০ হাজার টাকা এবং স্বর্ণালংকার ছিলো-যা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তিনি বলছিলেন, আমি এখন নিঃস্ব। সকালে নাস্তা কিনে খাব এমন টাকাও নেই হাতে।
শুধু নাসরিন আক্তারই নন। তার মতো অনেকেই তাদের পুড়ে যাওয়া ঘরের ছাই দেখছেন আর কাঁদছেন। কেউ বা অবুঝ শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে অপলক তাকিয়ে রয়েছেন। যেন নিজেও কিছু বুঝতে পারছেন না- কী থেকে কী হয়ে গেল।
পোড়া টিনের স্তুপের মধ্যে চুলা বানিয়ে রান্না করতে দেখা গেল এক নারীকে। বললেন, স্বপ্ন থেকে শুরু করে সবইতো শেষ। অন্তত খেয়ে তো বাঁচতে হবে। আরও কয়েক নারী ও পুরুষকে পোড়া স্তুপের মধ্যে কিছু একটা খুঁজতে দেখা গেল। তাদের আশা- যদি তাদের ঘরের কিছু উদ্ধার করা যায়!

এদিকে ঘটনাস্থল থেকে আমাদের রিপোর্টার আবু রায়হানের পাঠানো ভিডিওতে দেখা গেল এক বৃদ্ধাকে বিলাপ করতে। তিনি বার বার বলছিলেন, আমার দুটা মেয়ে আছে তারা অন্যের বাসায় কাজ করে। ছেলে নাই। যে উপার্জন করে এনে এরকম একটা ঘর তৈরি করবে। আমি এখন কোথায় যাব। আমারতো সব শেষ। এখানে আমি একাই থাকতাম এই বস্তিতে। মাঝে মাঝে মেয়েরা টাকা চাল দিয়ে যেত। এইবার দিয়ে তিনবার আগুনে ঘর পুড়লো।
এদিকে কড়াইল বস্তি পোড়ার দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই কাল রাত থেকে পোস্ট দিচ্ছেন। প্রশ্ন রাখছেন, এই পোড়ার যন্ত্রণা শেষ হবে কবে।
এদিকে বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। ফায়ার সার্ভিস কন্টোল রুমের এমও রাশেদ বিন খালিদ মানবজমিনকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এর আগে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৫টা ২২ মিনিটে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। এরপর একে একে ১৯টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে যোগ দেয়।
মঙ্গলবার রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে বস্তির অনেকটা এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া কর্মকর্তা আনোয়ার বিন সাত্তার। প্রাথমিকভাবে এখন পর্যন্ত হতাহতের কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
সোয়া পাঁচ ঘণ্টা ধরে সেখানে আগুন জ্বললেও পানি সংকটের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হয় ফায়ার সার্ভিসকে। সাড়ে ৭টার দিকে ঘটনাস্থলের পাশে বৌবাজার সংলগ্ন একটি নালায় সেচপাম্প বসিয়ে পানি সরবরাহের চেষ্টা করে ফায়ার সার্ভিস।














