‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে আইজিপির বক্তব্যের পক্ষে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতি
‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্যের সমর্থনে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি বলেছে, আইজিপির বক্তব্যকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘোষণা কিংবা আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে শাস্তি দেওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে না দেখে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বিষয়ে তাঁর মন্তব্য প্রকাশের আগে পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব কথা জানায় বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন সংগঠনটির সভাপতি কামরুল হাসান তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক মনিরুল হক ডাবলু।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত ২৬ অক্টোবর রাজধানীর চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং শাখার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইজিপির বক্তব্যে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সংগঠনটির নজরে এসেছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পুলিশের আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও সক্ষমতা তুলে ধরতেই আইজিপি শব্দটি ব্যবহার করেছেন বলে মনে করে সংগঠনটি।
পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের ভাষ্য, বক্তব্যের বিচ্ছিন্ন অংশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছালে প্রকৃত বক্তব্য সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই বক্তব্যের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পুলিশের দায়িত্ব পালনের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রায়ই সন্ত্রাসী ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের হামলার মুখোমুখি হতে হয়।
সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসে পুলিশের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনায় চারজন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ৩৭০ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনা দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের ঝুঁকি ও প্রতিকূলতার চিত্র তুলে ধরে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
এ প্রসঙ্গে গত ২৪ অক্টোবর গোপালগঞ্জের বেদগ্রাম খেয়াঘাট এলাকায় একটি মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। তাদের দাবি, ওই ঘটনায় তিনজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
এ ছাড়া গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় পুলিশের ওপর পাথর নিক্ষেপ করে হাতকড়াসহ এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়। এতে একজন পুলিশ সদস্য আহত হন বলে জানানো হয়েছে।
পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের বক্তব্য, এসব ঘটনায় পুলিশ সদস্যরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না করে সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। দায়িত্ব পালনের সময় বারবার হামলার শিকার হলে তাঁদের নিরাপত্তা ও মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকার এবং অপরাধ দমনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিবৃতিতে বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে আত্মরক্ষার অধিকারের বিষয়টি তুলে ধরে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৯৬ থেকে ১০৬ ধারা, ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১২৭ ও ১২৮ ধারা এবং পুলিশ প্রবিধানে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে প্রাসঙ্গিক নির্দেশনার উল্লেখ করা হয়।
তবে আইজিপির বক্তব্যকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘোষণা হিসেবে ব্যাখ্যা না করার আহ্বান জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকার ও অপরাধ দমনের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আইনের শাসন, মানবাধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।
একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বিষয়ে আইজিপির মন্তব্য নিয়েও বিবৃতিতে কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের বক্তব্য প্রকাশের আগে পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট যাচাই করার আহ্বান জানিয়ে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, মন্তব্যের বিচ্ছিন্ন অংশ প্রকাশ করলে প্রকৃত বক্তব্য সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
বিবৃতিতে পুলিশ ও গণমাধ্যমের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, পুলিশ অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করে, আর গণমাধ্যম জনগণের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়। তাই উভয় পক্ষের পেশাগত দায়িত্ব ও বাস্তবতা বোঝার পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখা জরুরি।
এর আগে ২৭ অক্টোবর ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে আইজিপির বক্তব্যের পক্ষে বিবৃতি দেয় বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএসএ)। সংগঠনটি বলেছে, আইজিপির বক্তব্যকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘোষণা হিসেবে না দেখে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের যথাযথ প্রয়োগ এবং অপরাধ দমনে পুলিশের দৃঢ় ভূমিকা নিশ্চিত করার আহ্বান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
বিপিএসএর সাধারণ সম্পাদক শামীমা পারভীনের স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, পরিবর্তিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ‘মব কালচার’ এবং ৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অপরাধ দমনে পুলিশের আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অযথা দ্বিধা তৈরি হলে অপরাধীরা উৎসাহিত হতে পারে বলেও মনে করে সংগঠনটি।
এর আগে সোমবার (২৬ অক্টোবর) আইজিপির বক্তব্য নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছিল পুলিশ সদর দপ্তর।





















