টনসিলাইটিস: কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও কখন প্রয়োজন অপারেশন
টনসিলাইটিস সাধারণত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও প্রাপ্তবয়স্করাও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। গলার পেছনের দুই পাশে থাকা টনসিলে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ও প্রদাহ হলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে টনসিলাইটিস বলা হয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নিলে কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
টনসিল মানবদেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি এক ধরনের লসিকাগ্রন্থি বা লিম্ফয়েড টিস্যু, যা গলার পেছনের দুই পাশে অবস্থান করে। বাইরে থেকে শরীরে প্রবেশ করা বিভিন্ন জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এটি ভূমিকা রাখে।
ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া—দুটিই দায়ী
টনসিলাইটিসের প্রধান কারণ ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। ভাইরাসের মধ্যে এডেনোভাইরাস ও ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ বিভিন্ন ভাইরাস দায়ী হতে পারে। ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে গ্রুপ এ বিটা-হেমোলাইটিক স্ট্রেপ্টোকক্কাস একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
সাধারণত ৩ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা যায়। তবে বড়রাও আক্রান্ত হতে পারেন। ঋতু পরিবর্তন, ঘন ঘন ঠান্ডা-সর্দি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া এবং পরিবেশগত বিভিন্ন কারণ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে
টনসিলাইটিস তীব্র বা দীর্ঘমেয়াদি—দুই ধরনের হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- গলায় তীব্র ব্যথা ও খাবার গিলতে কষ্ট
- জ্বর, মাথাব্যথা ও শরীর ব্যথা
- কানে ব্যথা
- ছোট শিশুদের মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা পড়া
- গুরুতর সংক্রমণে মুখ খুলতে কষ্ট হওয়া বা ট্রিজমাস
- গলা ফুলে যাওয়া ও দুর্বলতা
চিকিৎসায় কী করা হয়
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে টনসিলাইটিস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ভাইরাসজনিত ও ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসা এক নয়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পর্যাপ্ত পানি পান, বিশ্রাম এবং উষ্ণ লবণ-পানি দিয়ে গার্গল গলার অস্বস্তি কমাতে সহায়তা করতে পারে। জ্বর ও ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করা উচিত।
দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণে যেসব জটিলতা হতে পারে
সঠিক চিকিৎসা না হলে বা বারবার সংক্রমণ হলে দীর্ঘমেয়াদি টনসিল সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে টনসিলের আশপাশে পুঁজ জমে পেরিটনসিলার অ্যাবসেস হতে পারে।
এ ছাড়া টনসিল অতিরিক্ত বড় হয়ে গেলে ঘুমের সময় শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা দেখা দিতে পারে। স্ট্রেপ্টোকক্কাল সংক্রমণের কিছু জটিলতা হিসেবে বাতজ্বর বা কিডনির প্রদাহও দেখা দিতে পারে।
কখন অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে
বারবার গুরুতর টনসিলাইটিস হওয়া, টনসিলের কারণে শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি হওয়া, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হওয়ার সমস্যা বা টনসিলের আশপাশে বারবার ফোড়া হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক টনসিল অপারেশন বা টনসিলেকটমির পরামর্শ দিতে পারেন।
তবে অপারেশনের সিদ্ধান্ত রোগীর বয়স, সংক্রমণের মাত্রা, সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ গ্রহণ করেন।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ জরুরি
টনসিলাইটিস একটি সাধারণ সমস্যা হলেও তীব্র জ্বর, শ্বাস নিতে কষ্ট, লালা গিলতে না পারা, মুখ খুলতে সমস্যা বা গলার একপাশ অতিরিক্ত ফুলে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে একজন অভিজ্ঞ নাক-কান-গলা (ইএনটি) বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।






















