ঢাকা ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

নামেই কি বদলে যায় বৈশাখ?

নিজস্ব সংবাদ :

ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

পহেলা বৈশাখ বাঙালির জীবনে এমন এক দিন, যা কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি গভীর সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ, একটি ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং সম্মিলিত পরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ। এই দিনটি যেমন নতুন বছরের সূচনা চিহ্নিত করে, তেমনি এটি বহন করে শতাব্দীজুড়ে গড়ে ওঠা জীবনধারা, আচার, বিশ্বাস ও সামাজিক ঐক্যের বহুমাত্রিক প্রতিফলন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বৈশাখী শোভাযাত্রার নামকরণ ঘিরে যে বিতর্ক তীব্র হয়েছে, তা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে- নামেই কি বদলে যায় বৈশাখ?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হয় ইতিহাসের ভেতরে, যেখানে সংস্কৃতি কেবল উৎসব নয়, বরং প্রতিরোধ, পরিচয় ও অস্তিত্ব রক্ষার মাধ্যম হিসেবেও কাজ করেছে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে যে শোভাযাত্রার সূচনা, তা নিছক একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন ছিল না; বরং তা ছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এক সৃজনশীল প্রতিবাদের ভাষা। প্রতীক, মুখোশ ও শিল্পনির্মিত রূপকের মাধ্যমে তারা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান এবং শুভ শক্তির আহ্বানকে দৃশ্যমান করে তোলে। ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামটি তাই একটি নান্দনিক চিহ্নের পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বার্তাও বহন করেছিল।

সময়ের সাথে সাথে এই শোভাযাত্রা তার প্রাথমিক রাজনৈতিক তাৎপর্য অতিক্রম করে এক সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়। এতে অংশগ্রহণ করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ- শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, পেশাজীবী, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই। ধর্মীয় পরিচয় সেখানে গৌণ হয়ে পড়ে; প্রধান হয়ে ওঠে একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক চেতনা। এই প্রক্রিয়াটি সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় ‘collective identity formation’ বা সম্মিলিত পরিচয় নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তবে সংস্কৃতি কখনোই স্থির নয়; এটি পরিবর্তনশীল, বিতর্কিত এবং বিভিন্ন শক্তির প্রভাবাধীন। নব্বইয়ের দশক থেকেই বৈশাখী আয়োজনকে ঘিরে কিছু বিতর্ক দেখা দেয়, যেখানে একটি অংশ এটিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। ‘মঙ্গল’ শব্দটিকে হিন্দু ধর্মীয় অনুষঙ্গ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যদিও ভাষাতাত্ত্বিকভাবে ‘মঙ্গল’ শব্দটি বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় ‘শুভ’ বা ‘কল্যাণ’ অর্থেই ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। এই ধরনের ব্যাখ্যা সংস্কৃতির ওপর একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় কাঠামো আরোপের প্রচেষ্টা হিসেবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয় ২০১৬ সালে, যখন UNESCO ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে মানবজাতির অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এই স্বীকৃতি একদিকে যেমন জাতীয় গর্বের বিষয়, অন্যদিকে এটি শোভাযাত্রাটিকে একটি বৈশ্বিক প্রতীকে পরিণত করে। সাংস্কৃতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো উপাদান যখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়, তখন তা ‘symbolic capital’ অর্জন করে- অর্থাৎ এর সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। ফলে এই প্রতীককে কেন্দ্র করে নিয়ন্ত্রণ, ব্যাখ্যা ও মালিকানার প্রশ্নও তীব্র হয়ে ওঠে।

এই প্রেক্ষাপটে নাম নিয়ে বিতর্ক একটি নতুন মাত্রা পায়। ‘মঙ্গল’ শব্দের পরিবর্তে ‘আনন্দ’ বা ‘বৈশাখী’ শব্দ ব্যবহারের প্রস্তাব সামনে আসে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি ভাষাগত পরিবর্তন মনে হলেও, এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনেক গভীর। নাম এখানে একটি ‘discursive tool’- অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট বক্তব্য বা মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। ফলে নাম পরিবর্তনের প্রশ্নটি সংস্কৃতির নিরপেক্ষ বিবর্তন নয়; বরং এটি ক্ষমতা, আদর্শ ও পরিচয়ের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এই প্রসঙ্গে রাষ্ট্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যে শোভাযাত্রা একসময় ছিল শিল্পীদের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ, তা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার আওতায় আসে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যান্টোনিও গ্রামশির ‘cultural hegemony’ তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্র ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী সংস্কৃতির মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা সমাজে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘গ্রহণযোগ্য’ হিসেবে প্রতীয়মান হয়। ফলে শোভাযাত্রার নাম, প্রতীক ও উপস্থাপনায় রাষ্ট্রের প্রভাব একটি বৃহত্তর আদর্শিক কাঠামোর অংশ হতে পারে।

একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও এখানে উপেক্ষা করা যায় না। প্রতিটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রতীক রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা বহন করে। শোভাযাত্রার মোটিফ, ব্যানার বা প্রতীকের মাধ্যমে কখনো সরাসরি, কখনো পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এর ফলে সংস্কৃতি একটি ‘contested space’-এ পরিণত হয়, যেখানে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে।

ডিজিটাল যুগ এই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার তথ্যপ্রবাহকে যেমন দ্রুততর করেছে, তেমনি তা বিভ্রান্তি ও মেরুকরণের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। আংশিক তথ্য, আবেগপ্রবণ ভাষ্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা মুহূর্তেই জনমত তৈরি করছে। ফলে একটি সাংস্কৃতিক প্রশ্ন সহজেই রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিতর্কে রূপ নিচ্ছে। এটি ‘post-truth politics’-এর একটি উদাহরণ, যেখানে তথ্যের চেয়ে আবেগ ও বিশ্বাস বেশি প্রভাব বিস্তার করে।

তবে এই জটিলতার মাঝেও একটি মৌলিক বাস্তবতা অটুট রয়েছে- পহেলা বৈশাখ এখনও মানুষের উৎসব। প্রতি বছর ভোরের আলো ফুটতেই মানুষ রঙিন পোশাকে, গান, কবিতা ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। গ্রাম থেকে শহর- সব জায়গায় বৈশাখী মেলা, লোকসংগীত, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং সামাজিক মিলনের আয়োজন দেখা যায়। এই অংশগ্রহণমূলক চর্চাই বৈশাখকে জীবন্ত রাখে।

এখানেই মূল প্রশ্নটি ফিরে আসে- নামেই কি বদলে যায় বৈশাখ?

সাংস্কৃতিক তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, কোনো সংস্কৃতির সারবস্তু তার নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা নিহিত থাকে মানুষের চর্চা, অভ্যাস ও অভিজ্ঞতার মধ্যে। পিয়ের বুর্দিয়োর ‘habitus’ ধারণা অনুযায়ী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভ্যাসগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এমনভাবে গেঁথে থাকে যে তা সহজে পরিবর্তিত হয় না। বৈশাখও তেমনই একটি ‘lived experience’, যা নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

তবে নাম সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকও নয়। নাম একটি প্রতীক, যা অর্থ ও পরিচয় বহন করে। কিন্তু সেই অর্থ তখনই কার্যকর হয়, যখন তা মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। যদি নাম পরিবর্তন মানুষের চর্চিত বাস্তবতার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে তা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে।

অতএব, নাম পরিবর্তনের বিতর্ক আমাদের একটি বৃহত্তর প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়- আমরা কি বৈশাখের অন্তর্নিহিত চেতনাকে ধারণ করতে পারছি? সেই চেতনা, যা ভিন্নতাকে স্বীকার করে, মানুষকে একত্রিত করে এবং সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে একটি সম্মিলিত পরিচয় নির্মাণ করে।

বৈশাখের শক্তি তার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রে। এখানে ধর্ম, বর্ণ বা শ্রেণির বিভাজন নেই; বরং রয়েছে এক ধরনের সাংস্কৃতিক গণতন্ত্র, যেখানে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনা যদি অটুট থাকে, তাহলে নামের পরিবর্তন বৈশাখের সারবস্তুকে প্রভাবিত করতে পারবে না।

কিন্তু যদি আমরা এই চেতনাকে হারিয়ে ফেলি, যদি বৈশাখকে বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করি, তাহলে নাম অপরিবর্তিত থাকলেও এর অর্থ বদলে যাবে। তখন বৈশাখ আর মিলনের উৎসব থাকবে না; হয়ে উঠবে মতাদর্শিক সংঘাতের ক্ষেত্র।

সুতরাং, “নামেই কি বদলে যায় বৈশাখ?”- এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্রিক নয়। নাম পরিবর্তন নিজে বৈশাখকে বদলে দিতে পারে না; কিন্তু নামকে ঘিরে যে ব্যাখ্যা, রাজনীতি ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, তা বৈশাখের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বৈশাখের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে আমাদের ওপর- আমরা তাকে কীভাবে দেখি, কীভাবে চর্চা করি এবং কীভাবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিই। যদি আমরা তাকে উন্মুক্ততা, সহনশীলতা ও সম্মিলিত আনন্দের উৎস হিসেবে ধরে রাখতে পারি, তাহলে যে নামেই তাকে ডাকি না কেন, বৈশাখ তার স্বরূপে অটুট থাকবে।

আর যদি তা না পারি, তাহলে নাম নয়- আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দেবে আমাদের বৈশাখ।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৪:২৫:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬
৪৫১১ বার পড়া হয়েছে

ধানের শীষে ভোট দিন

নামেই কি বদলে যায় বৈশাখ?

আপডেট সময় ০৪:২৫:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

পহেলা বৈশাখ বাঙালির জীবনে এমন এক দিন, যা কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি গভীর সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ, একটি ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং সম্মিলিত পরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ। এই দিনটি যেমন নতুন বছরের সূচনা চিহ্নিত করে, তেমনি এটি বহন করে শতাব্দীজুড়ে গড়ে ওঠা জীবনধারা, আচার, বিশ্বাস ও সামাজিক ঐক্যের বহুমাত্রিক প্রতিফলন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বৈশাখী শোভাযাত্রার নামকরণ ঘিরে যে বিতর্ক তীব্র হয়েছে, তা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে- নামেই কি বদলে যায় বৈশাখ?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হয় ইতিহাসের ভেতরে, যেখানে সংস্কৃতি কেবল উৎসব নয়, বরং প্রতিরোধ, পরিচয় ও অস্তিত্ব রক্ষার মাধ্যম হিসেবেও কাজ করেছে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে যে শোভাযাত্রার সূচনা, তা নিছক একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন ছিল না; বরং তা ছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এক সৃজনশীল প্রতিবাদের ভাষা। প্রতীক, মুখোশ ও শিল্পনির্মিত রূপকের মাধ্যমে তারা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান এবং শুভ শক্তির আহ্বানকে দৃশ্যমান করে তোলে। ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামটি তাই একটি নান্দনিক চিহ্নের পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বার্তাও বহন করেছিল।

সময়ের সাথে সাথে এই শোভাযাত্রা তার প্রাথমিক রাজনৈতিক তাৎপর্য অতিক্রম করে এক সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়। এতে অংশগ্রহণ করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ- শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, পেশাজীবী, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই। ধর্মীয় পরিচয় সেখানে গৌণ হয়ে পড়ে; প্রধান হয়ে ওঠে একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক চেতনা। এই প্রক্রিয়াটি সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় ‘collective identity formation’ বা সম্মিলিত পরিচয় নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তবে সংস্কৃতি কখনোই স্থির নয়; এটি পরিবর্তনশীল, বিতর্কিত এবং বিভিন্ন শক্তির প্রভাবাধীন। নব্বইয়ের দশক থেকেই বৈশাখী আয়োজনকে ঘিরে কিছু বিতর্ক দেখা দেয়, যেখানে একটি অংশ এটিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। ‘মঙ্গল’ শব্দটিকে হিন্দু ধর্মীয় অনুষঙ্গ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যদিও ভাষাতাত্ত্বিকভাবে ‘মঙ্গল’ শব্দটি বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় ‘শুভ’ বা ‘কল্যাণ’ অর্থেই ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। এই ধরনের ব্যাখ্যা সংস্কৃতির ওপর একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় কাঠামো আরোপের প্রচেষ্টা হিসেবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয় ২০১৬ সালে, যখন UNESCO ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে মানবজাতির অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এই স্বীকৃতি একদিকে যেমন জাতীয় গর্বের বিষয়, অন্যদিকে এটি শোভাযাত্রাটিকে একটি বৈশ্বিক প্রতীকে পরিণত করে। সাংস্কৃতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো উপাদান যখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়, তখন তা ‘symbolic capital’ অর্জন করে- অর্থাৎ এর সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। ফলে এই প্রতীককে কেন্দ্র করে নিয়ন্ত্রণ, ব্যাখ্যা ও মালিকানার প্রশ্নও তীব্র হয়ে ওঠে।

এই প্রেক্ষাপটে নাম নিয়ে বিতর্ক একটি নতুন মাত্রা পায়। ‘মঙ্গল’ শব্দের পরিবর্তে ‘আনন্দ’ বা ‘বৈশাখী’ শব্দ ব্যবহারের প্রস্তাব সামনে আসে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি ভাষাগত পরিবর্তন মনে হলেও, এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনেক গভীর। নাম এখানে একটি ‘discursive tool’- অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট বক্তব্য বা মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। ফলে নাম পরিবর্তনের প্রশ্নটি সংস্কৃতির নিরপেক্ষ বিবর্তন নয়; বরং এটি ক্ষমতা, আদর্শ ও পরিচয়ের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এই প্রসঙ্গে রাষ্ট্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যে শোভাযাত্রা একসময় ছিল শিল্পীদের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ, তা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার আওতায় আসে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যান্টোনিও গ্রামশির ‘cultural hegemony’ তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্র ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী সংস্কৃতির মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা সমাজে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘গ্রহণযোগ্য’ হিসেবে প্রতীয়মান হয়। ফলে শোভাযাত্রার নাম, প্রতীক ও উপস্থাপনায় রাষ্ট্রের প্রভাব একটি বৃহত্তর আদর্শিক কাঠামোর অংশ হতে পারে।

একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও এখানে উপেক্ষা করা যায় না। প্রতিটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রতীক রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা বহন করে। শোভাযাত্রার মোটিফ, ব্যানার বা প্রতীকের মাধ্যমে কখনো সরাসরি, কখনো পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এর ফলে সংস্কৃতি একটি ‘contested space’-এ পরিণত হয়, যেখানে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে।

ডিজিটাল যুগ এই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার তথ্যপ্রবাহকে যেমন দ্রুততর করেছে, তেমনি তা বিভ্রান্তি ও মেরুকরণের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। আংশিক তথ্য, আবেগপ্রবণ ভাষ্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা মুহূর্তেই জনমত তৈরি করছে। ফলে একটি সাংস্কৃতিক প্রশ্ন সহজেই রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিতর্কে রূপ নিচ্ছে। এটি ‘post-truth politics’-এর একটি উদাহরণ, যেখানে তথ্যের চেয়ে আবেগ ও বিশ্বাস বেশি প্রভাব বিস্তার করে।

তবে এই জটিলতার মাঝেও একটি মৌলিক বাস্তবতা অটুট রয়েছে- পহেলা বৈশাখ এখনও মানুষের উৎসব। প্রতি বছর ভোরের আলো ফুটতেই মানুষ রঙিন পোশাকে, গান, কবিতা ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। গ্রাম থেকে শহর- সব জায়গায় বৈশাখী মেলা, লোকসংগীত, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং সামাজিক মিলনের আয়োজন দেখা যায়। এই অংশগ্রহণমূলক চর্চাই বৈশাখকে জীবন্ত রাখে।

এখানেই মূল প্রশ্নটি ফিরে আসে- নামেই কি বদলে যায় বৈশাখ?

সাংস্কৃতিক তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, কোনো সংস্কৃতির সারবস্তু তার নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা নিহিত থাকে মানুষের চর্চা, অভ্যাস ও অভিজ্ঞতার মধ্যে। পিয়ের বুর্দিয়োর ‘habitus’ ধারণা অনুযায়ী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভ্যাসগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এমনভাবে গেঁথে থাকে যে তা সহজে পরিবর্তিত হয় না। বৈশাখও তেমনই একটি ‘lived experience’, যা নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

তবে নাম সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকও নয়। নাম একটি প্রতীক, যা অর্থ ও পরিচয় বহন করে। কিন্তু সেই অর্থ তখনই কার্যকর হয়, যখন তা মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। যদি নাম পরিবর্তন মানুষের চর্চিত বাস্তবতার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে তা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে।

অতএব, নাম পরিবর্তনের বিতর্ক আমাদের একটি বৃহত্তর প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়- আমরা কি বৈশাখের অন্তর্নিহিত চেতনাকে ধারণ করতে পারছি? সেই চেতনা, যা ভিন্নতাকে স্বীকার করে, মানুষকে একত্রিত করে এবং সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে একটি সম্মিলিত পরিচয় নির্মাণ করে।

বৈশাখের শক্তি তার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রে। এখানে ধর্ম, বর্ণ বা শ্রেণির বিভাজন নেই; বরং রয়েছে এক ধরনের সাংস্কৃতিক গণতন্ত্র, যেখানে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনা যদি অটুট থাকে, তাহলে নামের পরিবর্তন বৈশাখের সারবস্তুকে প্রভাবিত করতে পারবে না।

কিন্তু যদি আমরা এই চেতনাকে হারিয়ে ফেলি, যদি বৈশাখকে বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করি, তাহলে নাম অপরিবর্তিত থাকলেও এর অর্থ বদলে যাবে। তখন বৈশাখ আর মিলনের উৎসব থাকবে না; হয়ে উঠবে মতাদর্শিক সংঘাতের ক্ষেত্র।

সুতরাং, “নামেই কি বদলে যায় বৈশাখ?”- এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্রিক নয়। নাম পরিবর্তন নিজে বৈশাখকে বদলে দিতে পারে না; কিন্তু নামকে ঘিরে যে ব্যাখ্যা, রাজনীতি ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, তা বৈশাখের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বৈশাখের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে আমাদের ওপর- আমরা তাকে কীভাবে দেখি, কীভাবে চর্চা করি এবং কীভাবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিই। যদি আমরা তাকে উন্মুক্ততা, সহনশীলতা ও সম্মিলিত আনন্দের উৎস হিসেবে ধরে রাখতে পারি, তাহলে যে নামেই তাকে ডাকি না কেন, বৈশাখ তার স্বরূপে অটুট থাকবে।

আর যদি তা না পারি, তাহলে নাম নয়- আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দেবে আমাদের বৈশাখ।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক