জঙ্গল সলিমপুর: রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্র নাকি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি?
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর সাম্প্রতিক সময়ে আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) ওপর সংঘবদ্ধ হামলা, একজন কর্মকর্তার নিহত হওয়া এবং অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা শুধু একটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র কয়েক মিনিট দূরের একটি এলাকা কীভাবে বছরের পর বছর কার্যত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আজ জঙ্গল সলিমপুরকে নতুন করে বিবেচনা করতে হচ্ছে।
র্যাবের মহাপরিচালক নিজেই জঙ্গল সলিমপুরকে ‘সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এমন স্বীকারোক্তি একদিকে বাস্তবতার প্রতিফলন, অন্যদিকে রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ব্যর্থতারও ইঙ্গিত। কারণ এই পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হয়নি। বহু বছর ধরেই বন বিভাগের জমি দখল, পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি গড়ে তোলা এবং অপরাধী গোষ্ঠীর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে এলাকাটির পরিচিতি গড়ে উঠেছে- সবই রাষ্ট্রের চোখের সামনেই।
জঙ্গল প্রাসলিমপুরকেয়ই ‘দুর্গম’ এলাকা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, সংকীর্ণ প্রবেশপথ এবং ঘনবসতির কারণে অভিযান চালানো যে কঠিন, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে প্রশ্ন হলো, চট্টগ্রাম নগরের এত কাছের একটি এলাকায় রাষ্ট্র যদি কার্যকরভাবে প্রবেশই করতে না পারে, তাহলে সেটিকে কেবল ভূগোলের দোষ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় কি না। বাংলাদেশ আরও দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকাতেও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। সুতরাং এখানে সমস্যার মূল ভূপ্রকৃতি নয়; বরং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক শৈথিল্য ও রাজনৈতিক আপস।
এই শৈথিল্যের সুযোগ নিয়েই জঙ্গল সলিমপুরে গড়ে উঠেছে এক ধরনের সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা। স্থানীয় চেকপোস্ট, পরিচয়পত্র ছাড়া প্রবেশে বাধা, স্টিকারবিহীন যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা- এসব একটি কার্যত স্বশাসিত এলাকার লক্ষণ। রাষ্ট্রীয় আইনের পরিবর্তে সেখানে কার্যকর হয়েছে অপরাধী গোষ্ঠীর নিয়ম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গোষ্ঠীগুলো আরও সংগঠিত হয়েছে, শক্তিশালী হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানানোর সাহস পেয়েছে।
তবে জঙ্গল সলিমপুরের বাস্তবতা কেবল অপরাধী গোষ্ঠীর গল্প নয়; এখানে রয়েছে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের বসবাস। ধারণা করা হয়, এক থেকে দেড় লাখ মানুষ সেখানে থাকেন, যাদের বড় একটি অংশই নিম্ন আয়ের ও ছিন্নমূল। শহরের অন্য কোথাও বাসা ভাড়া বা জমির দাম বহন করতে না পেরে তারা এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। এই জনগোষ্ঠীই রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় নৈতিক ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
একদিকে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। প্রশাসনের কর্মকর্তারাই স্বীকার করেছেন, ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করলে বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু এই দ্বিধা কি বছরের পর বছর ধরে একটি এলাকাকে কার্যত ছেড়ে দেওয়ার যুক্তি হতে পারে? বরং এই বাস্তবতাই প্রমাণ করে, রাষ্ট্র শুরু থেকেই পরিকল্পিত পুনর্বাসন ও সামাজিক সুরক্ষার পথে না গিয়ে সমস্যাটিকে জটিল করে তুলেছে। ফলে আজ সন্ত্রাসীরা সাধারণ মানুষকে মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে।
এখানে রাজনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় পর্যায়ে জঙ্গল সলিমপুর মানে হাজার হাজার ভোট। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, এই ভোটব্যাংককে বিরূপ করতে কেউই আগ্রহী নয়- এমন অভিযোগ স্থানীয় সাংবাদিকদের। সরাসরি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলেও একধরনের নীরব সমঝোতা যে গড়ে উঠেছে, তা অস্বীকার করা কঠিন। এর ফলেই উচ্ছেদ অভিযান, উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ বারবার থমকে গেছে।
র্যাবের ওপর সাম্প্রতিক হামলা এই দীর্ঘদিনের অবহেলারই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে হামলা, শত শত মানুষের সংঘবদ্ধ আক্রমণ- এসব শুধু অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। এই ঘটনার পর ‘জোরালো অভিযানের’ ঘোষণা এসেছে। কিন্তু কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।
জঙ্গল সলিমপুরের মতো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত রাষ্ট্রীয় কৌশল। অপরাধী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক ও গোয়েন্দাভিত্তিক ব্যবস্থা, সাধারণ মানুষের জন্য ধাপে ধাপে পুনর্বাসন ও বিকল্প আবাসনের পরিকল্পনা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে রাজনৈতিক ঐকমত্য- এই তিনটি উপাদান ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
জঙ্গল সলিমপুর কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম নয়; এটি বাংলাদেশের নগরায়ন, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা কাঠামোর গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। আজ যদি রাষ্ট্র এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও অনেক এলাকাই ‘রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্র’ হয়ে ওঠার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক














