ঢাকা ১০:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo নির্বাচনী প্রচারণায় নারী ও হিজাবধারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে হাইকোর্টে রিট Logo নির্বাচনী আচরণবিধিতে ইসির বড় পরিবর্তন: ভোটার স্লিপ ও মাইক ব্যবহারে নতুন নিয়ম Logo শার্শায় বিএনপির নির্বাচনী পথসভা, জন সমুদে পরিণত Logo এক যুগেও সন্ধান মেলেনি বিএনপি নেতা ওমর ফারুকের Logo বিএসসি ও ডিপ্লোমা দ্বন্দ্ব: সাতরাস্তা মোড় অবরোধ করে কারিগরি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ Logo শুক্রবার বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার সম্ভাবনা Logo ‘গুপ্ত সংগঠনের ব্যক্তিরা নতুন জালেম রূপে আবির্ভূত হয়েছে’: বরিশালে তারেক রহমান Logo নির্বাচন ঘিরে বান্দরবান-মিয়ানমার সীমান্তে বিজিবির নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা Logo আকবরশাহ থানায় পর্নোগ্রাফি ও চাঁদাবাজি মামলার পলাতক আসামি আসিফ গ্রেফতার-র‌্যাব-৭ Logo আসন্ন নির্বাচনে কোনো দলের পক্ষ নেবে না যুক্তরাষ্ট্র: মার্কিন রাষ্ট্রদূত

সংলাপের আহ্বান, ঐক্য কি সম্ভব: নির্বাচনের পর কোন সরকার

নিজস্ব সংবাদ :

ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন-পরবর্তী সরকার কাঠামো নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। অতীতেও নানা সময়ে জাতীয় সরকার, সর্বদলীয় সরকার কিংবা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধারণা আলোচনায় এসেছে। তবে সাম্প্রতিক সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির প্রস্তাবিত ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ এবং জামায়াতে ইসলামীর উত্থাপিত ‘জাতীয় সরকার’- এর ধারণা নতুন করে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নামের দিক থেকে কাছাকাছি মনে হলেও এই দুই প্রস্তাবের রাজনৈতিক দর্শন, ক্ষমতার কাঠামো এবং অংশীদারিত্বের সীমারেখা ভিন্ন বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে।

প্রথম দৃষ্টিতে উভয় প্রস্তাবই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জাতীয় ঐক্য এবং সংকট উত্তরণের কথা বলে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের প্রস্তাব স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয় শোনায়। কিন্তু গভীরে তাকালে দেখা যায়, বিএনপি ও জামায়াতের প্রস্তাব কেবল আলাদা নয়, বরং পরস্পর থেকে দূরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থানকে নির্দেশ করে।

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের বক্তব্য সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। তিনি নির্বাচনের পর সরকার গঠনের আগে বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, দেশের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সম্মিলিতভাবে। তিনি অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সংকটের কথা উল্লেখ করে দাবি করেছেন, এসব চ্যালেঞ্জ একক কোনো দলের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তার বক্তব্যে সরাসরি সরকারে অংশগ্রহণের দাবি না থাকলেও একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার কাঠামোর ইঙ্গিত স্পষ্ট।

এই অবস্থান জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশলের একটি দিকও প্রকাশ করে। দলটি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক যুক্তি দাঁড় করাতে চায়। ‘জাতীয় সরকার’-এর ধারণার মাধ্যমে তারা বোঝাতে চায়, একদলীয় বা একজোটের সরকার নয়, বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সমন্বয়েই বর্তমান সংকট উত্তরণ সম্ভব। তবে এই প্রস্তাবের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো-এর কাঠামো ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অস্পষ্ট। কে নেতৃত্ব দেবে, কীভাবে সিদ্ধান্ত হবে, সংসদের ভূমিকা কী হবে- এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে বিএনপি ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ প্রস্তাব করলেও সেখানে ঐকমত্যের পরিধি সীমিত। বিএনপির বক্তব্য অনুযায়ী, এই সরকার গঠিত হবে কেবল তাদের যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের নিয়ে। অর্থাৎ এটি সর্বদলীয় নয়, বরং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক জোটভিত্তিক একটি সরকার কাঠামো। বিএনপি আগেই স্পষ্ট করেছে যে, তাদের প্রস্তাবিত কাঠামোয় জামায়াতের কোনো স্থান নেই। এটি নিছক কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং বিএনপির রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক ইমেজ বিবেচনার প্রতিফলন।

এই জায়গাতেই ‘জাতীয় সরকার’ ও ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’- এর মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জামায়াতের প্রস্তাব তাত্ত্বিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক হলেও বাস্তব রূপরেখাহীন, আর বিএনপির প্রস্তাব কাঠামোগতভাবে নির্দিষ্ট হলেও রাজনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ। ফলে উভয় প্রস্তাবই আংশিক, সম্পূর্ণ নয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো- নির্বাচনী রাজনীতিতে এই দুই দল এখন দুটি পৃথক শিবিরের নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিএনপি তাদের যুগপৎ আন্দোলনের মিত্রদের নিয়ে আসন সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। বিপরীতে জামায়াত তাদের সমমনা ইসলামপন্থী ও নতুন রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে আলাদা একটি জোট গড়ে তুলেছে। এই দুটি শিবির নির্বাচনের মাঠে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে থাকা শক্তিগুলোর মধ্যে নির্বাচন-পরবর্তী সরকারে যৌথ অংশগ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই কঠিন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখানে কেবল কৌশলগত দূরত্ব নয়, রয়েছে আদর্শিক ও সাংগঠনিক বিভাজন। বিএনপি একটি নেতৃত্বনির্ভর, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তভিত্তিক সরকার কাঠামোতে বিশ্বাসী, যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াত তুলনামূলকভাবে নৈতিকতা, অংশগ্রহণ ও সমঝোতার ভাষা ব্যবহার করলেও তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে বিএনপির মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

তবে এই বিতর্কের একটি বড় তাৎপর্য হলো-এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশে একপক্ষীয় নির্বাচন, দুর্বল সংসদ এবং কার্যকর বিরোধী দলের অনুপস্থিতি গণতান্ত্রিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘জাতীয় সরকার’ বা ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’-এর ধারণা আসলে একটি গভীর রাজনৈতিক অসন্তোষের প্রতিফলন। মানুষ বুঝতে পারছে, শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, শাসনব্যবস্থার ধরনেও পরিবর্তন প্রয়োজন।

জামায়াতের বক্তব্যে যে বিষয়টি গুরুত্ব পায়, তা হলো- রাষ্ট্র পরিচালনায় একক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। এই উপলব্ধি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে বিএনপির জন্যও প্রশ্ন থেকে যায়- যদি তারা ক্ষমতায় আসে এবং সংসদে কার্যকর বিরোধী দল না থাকে, তাহলে সেই সরকার কতটা টেকসই ও গণতান্ত্রিক হবে? ইতিহাস বলছে, দুর্বল বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত সরকারকেও দুর্বল করে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বিএনপি ও জামায়াতের প্রকাশ্য প্রস্তাবনায় কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই। বরং পার্থক্যই এখানে মুখ্য। নির্বাচনের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে সরকার গঠনের ধরন। তবে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং গণতান্ত্রিক আস্থা ফেরাতে সংলাপ, স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন থাকবে, তেমনি দায়িত্বশীল সমঝোতাও প্রয়োজন। জাতীয় সরকার বা জাতীয় ঐকমত্যের সরকার- যে নামেই হোক না কেন, বাস্তব গণতান্ত্রিক চর্চা ছাড়া কোনো কাঠামোই দেশের সংকটের টেকসই সমাধান দিতে পারবে না।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৫:৪১:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
৪৫৩৯ বার পড়া হয়েছে

ধানের শীষে ভোট দিন

সংলাপের আহ্বান, ঐক্য কি সম্ভব: নির্বাচনের পর কোন সরকার

আপডেট সময় ০৫:৪১:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন-পরবর্তী সরকার কাঠামো নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। অতীতেও নানা সময়ে জাতীয় সরকার, সর্বদলীয় সরকার কিংবা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধারণা আলোচনায় এসেছে। তবে সাম্প্রতিক সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির প্রস্তাবিত ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ এবং জামায়াতে ইসলামীর উত্থাপিত ‘জাতীয় সরকার’- এর ধারণা নতুন করে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নামের দিক থেকে কাছাকাছি মনে হলেও এই দুই প্রস্তাবের রাজনৈতিক দর্শন, ক্ষমতার কাঠামো এবং অংশীদারিত্বের সীমারেখা ভিন্ন বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে।

প্রথম দৃষ্টিতে উভয় প্রস্তাবই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জাতীয় ঐক্য এবং সংকট উত্তরণের কথা বলে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের প্রস্তাব স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয় শোনায়। কিন্তু গভীরে তাকালে দেখা যায়, বিএনপি ও জামায়াতের প্রস্তাব কেবল আলাদা নয়, বরং পরস্পর থেকে দূরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থানকে নির্দেশ করে।

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের বক্তব্য সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। তিনি নির্বাচনের পর সরকার গঠনের আগে বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, দেশের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সম্মিলিতভাবে। তিনি অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সংকটের কথা উল্লেখ করে দাবি করেছেন, এসব চ্যালেঞ্জ একক কোনো দলের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তার বক্তব্যে সরাসরি সরকারে অংশগ্রহণের দাবি না থাকলেও একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার কাঠামোর ইঙ্গিত স্পষ্ট।

এই অবস্থান জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশলের একটি দিকও প্রকাশ করে। দলটি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক যুক্তি দাঁড় করাতে চায়। ‘জাতীয় সরকার’-এর ধারণার মাধ্যমে তারা বোঝাতে চায়, একদলীয় বা একজোটের সরকার নয়, বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সমন্বয়েই বর্তমান সংকট উত্তরণ সম্ভব। তবে এই প্রস্তাবের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো-এর কাঠামো ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অস্পষ্ট। কে নেতৃত্ব দেবে, কীভাবে সিদ্ধান্ত হবে, সংসদের ভূমিকা কী হবে- এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে বিএনপি ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ প্রস্তাব করলেও সেখানে ঐকমত্যের পরিধি সীমিত। বিএনপির বক্তব্য অনুযায়ী, এই সরকার গঠিত হবে কেবল তাদের যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের নিয়ে। অর্থাৎ এটি সর্বদলীয় নয়, বরং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক জোটভিত্তিক একটি সরকার কাঠামো। বিএনপি আগেই স্পষ্ট করেছে যে, তাদের প্রস্তাবিত কাঠামোয় জামায়াতের কোনো স্থান নেই। এটি নিছক কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং বিএনপির রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক ইমেজ বিবেচনার প্রতিফলন।

এই জায়গাতেই ‘জাতীয় সরকার’ ও ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’- এর মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জামায়াতের প্রস্তাব তাত্ত্বিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক হলেও বাস্তব রূপরেখাহীন, আর বিএনপির প্রস্তাব কাঠামোগতভাবে নির্দিষ্ট হলেও রাজনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ। ফলে উভয় প্রস্তাবই আংশিক, সম্পূর্ণ নয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো- নির্বাচনী রাজনীতিতে এই দুই দল এখন দুটি পৃথক শিবিরের নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিএনপি তাদের যুগপৎ আন্দোলনের মিত্রদের নিয়ে আসন সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। বিপরীতে জামায়াত তাদের সমমনা ইসলামপন্থী ও নতুন রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে আলাদা একটি জোট গড়ে তুলেছে। এই দুটি শিবির নির্বাচনের মাঠে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে থাকা শক্তিগুলোর মধ্যে নির্বাচন-পরবর্তী সরকারে যৌথ অংশগ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই কঠিন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখানে কেবল কৌশলগত দূরত্ব নয়, রয়েছে আদর্শিক ও সাংগঠনিক বিভাজন। বিএনপি একটি নেতৃত্বনির্ভর, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তভিত্তিক সরকার কাঠামোতে বিশ্বাসী, যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াত তুলনামূলকভাবে নৈতিকতা, অংশগ্রহণ ও সমঝোতার ভাষা ব্যবহার করলেও তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে বিএনপির মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

তবে এই বিতর্কের একটি বড় তাৎপর্য হলো-এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশে একপক্ষীয় নির্বাচন, দুর্বল সংসদ এবং কার্যকর বিরোধী দলের অনুপস্থিতি গণতান্ত্রিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘জাতীয় সরকার’ বা ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’-এর ধারণা আসলে একটি গভীর রাজনৈতিক অসন্তোষের প্রতিফলন। মানুষ বুঝতে পারছে, শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, শাসনব্যবস্থার ধরনেও পরিবর্তন প্রয়োজন।

জামায়াতের বক্তব্যে যে বিষয়টি গুরুত্ব পায়, তা হলো- রাষ্ট্র পরিচালনায় একক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। এই উপলব্ধি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে বিএনপির জন্যও প্রশ্ন থেকে যায়- যদি তারা ক্ষমতায় আসে এবং সংসদে কার্যকর বিরোধী দল না থাকে, তাহলে সেই সরকার কতটা টেকসই ও গণতান্ত্রিক হবে? ইতিহাস বলছে, দুর্বল বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত সরকারকেও দুর্বল করে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বিএনপি ও জামায়াতের প্রকাশ্য প্রস্তাবনায় কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই। বরং পার্থক্যই এখানে মুখ্য। নির্বাচনের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে সরকার গঠনের ধরন। তবে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং গণতান্ত্রিক আস্থা ফেরাতে সংলাপ, স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন থাকবে, তেমনি দায়িত্বশীল সমঝোতাও প্রয়োজন। জাতীয় সরকার বা জাতীয় ঐকমত্যের সরকার- যে নামেই হোক না কেন, বাস্তব গণতান্ত্রিক চর্চা ছাড়া কোনো কাঠামোই দেশের সংকটের টেকসই সমাধান দিতে পারবে না।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক