শহীদ পরিবার ও আহতদের সঙ্গে তারেক রহমান
শহীদ পরিবারের চিকিৎসা ও পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসনের বড় প্রতিশ্রুতি দিলেন তারেক রহমান
বিগত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের আমলে গুম-খুনের শিকার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মতবিনিময়ের পরদিন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আগামী সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত, অত্যন্ত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি। একইসঙ্গে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আলাদা বিভাগ করে জুলাই শহীদ পরিবার ও আহতদের দেখভাল করা হবে বলে ঘোষণা দেন। গতকাল রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপি’র উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান অতিথি সারিতে শহীদ পরিবারের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।
শহীদ পরিবারের সদস্যরা তাদের মনের বেদনা-কষ্টের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লে পুরো অনুষ্ঠানস্থল এক অন্যরকম পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তারেক রহমান আলোচনার একপর্যায়ে আহতের আর্তি শুনতে মঞ্চের নিজের আসন ছেড়ে সামনে এসে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের সান্ত্বনা দেন। ওদিকে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি করেছেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা। তাদের ভাষ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল, সেই আশা পূরর্ণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের ওপর থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস ভেঙে গেছে। কারণ তারা এ পর্যন্ত একটি বিচারও দৃশ্যমান করতে পারেননি। আগামী নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় এলে সকল শহীদ হত্যার বিচার করবেন-এটাই তাদের বিশ্বাস।
’২৪-এর আন্দোলন কোনো দলের নয় মন্তব্য করে তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলন কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠির নয়। এই আন্দোলন ছিল সত্যিকার অর্থেই অধিকারহারা, গণতান্ত্রিক মানুষের গণ-আন্দোলন। এই কারণেই আমি বলি, ১৯৭১ সাল ছিল স্বাধীনতা অর্জনের, ২০২৪ সালের আন্দোলন ছিল দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার। সুতরাং ২০২৪ সালকে যদি সুসংহত করতে হয় তাহলে দেশের সকল নারী-পুরুষ এবং প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন।
সকলকে সজাগ থাকতে হবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, যারা স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলনকে দলীয় স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনের পরিণত করতে চায় তাদের সম্পর্কে স্বাধীনতা প্রিয় গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষকে অবশ্যই সজাগ থাকা জরুরি। ২০২৪ সালের স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলনে হতাহত পরিবারের স্বজন কিংবা আহতদের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা আমরা আজকে এই অনুষ্ঠানে শুনেছি। তাদের এই কষ্ট কোনো কিছু দিয়ে মোচন করা সম্ভব নয়। কারণ আমিও জানি স্বজন হারানোর বেদনা কতোটুকু, কোনো কিছু দিয়ে এই বেদনা মোচন করা যায় না। তবে দুইভাবে গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার চেষ্টা করতে পারি। এক. রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা। দুই. যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই সাহসী মানুষগুলো রাজপথে নেমে এসেছিল রাষ্ট্র এবং সমাজের সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা।
আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশ্যে বিএনপি’র চেয়ারম্যান বলেন, আপনাদের কষ্টের কথা, ব্যথার কথা, ত্যাগের কথা বলার জন্য ব্যাকুলভাবে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছিলেন। অস্থিরভাবে প্রকাশ করছিলেন নিজের মনের কষ্টের কথা। তখন আমি এবং নজরুল ইসলাম খান সাহেব বসে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। বিএনপি এর আগে যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল তখন মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় নামক একটি মন্ত্রণালয় তৈরি করেছে, ১৯৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন অর্থাৎ এক কথায় মুক্তিযোদ্ধা পরিবারদের কল্যাণ তারা দেখভাল করে থাকে। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশের মানুষের সমর্থনে বিএনপি আগামীদিনে সরকার গঠনে সক্ষম হলে এই শহীদ পরিবার যারা আছেন, জুলাইযোদ্ধা যারা আছেন, জুলাই আন্দোলনের যারা শহীদ পরিবার বা যোদ্ধা আছেন- তাদের যে কষ্টের কথাগুলো যে কয়জন ব্যক্তি, যে কয়জন মানুষ তুলে ধরেছেন, সেই কষ্টগুলোর যাতে আমরা কিছুটা হলেও সমাধান করতে পারি, যাকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি তাকে তো আমরা ফিরিয়ে আনতে পারবো না। কিন্তু যারা পেছনে রয়ে গিয়েছেন, সেই পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন সুবিধা-অসুবিধাগুলো যাতে দেখভাল করতে পারি, সেজন্য মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আমরা আরেকটি ডিপার্টমেন্ট তৈরি করবো, যাদের দায়িত্ব হবে এই মানুষগুলোর দেখভাল করা।
তারেক রহমান বলেন, তারাও (২৪’র যোদ্ধারা) একজন মুক্তিযোদ্ধা। তারাও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য। একাত্তর সালে এই দেশের মানুষ, মুক্তিযোদ্ধারা এদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য জীবন দিয়েছিলেন, এই দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যোদ্ধারা ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। ঠিক একইভাবে ’২৪-এর যোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন, তারা স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার যুদ্ধ করেছেন। স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছিল একাত্তর সালে। তাকেই আবার রক্ষা করা হয়েছে ২০২৪ সালে। সেজন্যই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমরা আপনাদের জন্য আরেকটি বিভাগ তৈরি করবো।
জুলাইয়ে গণহত্যা হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, শুধুমাত্র জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও ১৪শ’রও বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন ত্রিশ হাজারের মতো মানুষ। এই ত্রিশ হাজারের মতো মানুষের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের সংখ্যা ৫শ’ মতো। যাদের কারও এক চোখ অথবা কারও দুই চোখই নষ্ট হয়ে গিয়েছে, পঙ্গু হয়েছেন অনেকে। জুলাই অভ্যুত্থানে যেভাবে দেড় হাজারের মতো মানুষকে যে হত্যা করা হয়েছে, এটিকে এক বাক্যে স্রেফ আমরা একটি গণহত্যা বলতে পারি।
বিএনপি’র চেয়ারম্যান বলেন, আপনাদের সাহসী ভূমিকার কারণেই ফ্যাসিবাদী চক্র শুধুমাত্র রাষ্ট্রক্ষমতা নয় বরং এই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। ২০২৪ সালের ১৯শে আগস্ট আমি আপনাদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে একটি বক্তব্য রেখেছিলাম। সেই বক্তব্যে আমি বলেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শহীদ আবু সাঈদ, মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, কলেজছাত্র ওয়াসিম আকরাম, মাদ্রাসাছাত্র আব্দুল্লাহ আল মামুন, স্কুলছাত্র রিফাত হোসেন, কুমিল্লার আইনজীবী আবুল কালাম, চুয়াডাঙ্গার রাজমিস্ত্রি উজ্জ্বল হোসেন, নোয়াখালীর দোকান কর্মচারী আসিফ, বরগুনার ওষুধ কোম্পানির সেলসম্যান আল আমিন, পাবনার গাড়িচালক আরাফাত হোসেন, মিরপুরের গুলিবিদ্ধ ২২ বছর বয়সী মুত্তাকিন, দোকান কর্মচারী আতিকুল, অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তামিমের মতন অনেকের হাত কিংবা পা কেটে ফেলতে হয়েছে। হত্যা থেকে ছয় বছরের শিশু রিয়া গোপাও কিন্তু রেহাই পায়নি সেদিন। এ সময় ২৪ সালের শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনার পাশাপাশি আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন বিএনপি’র চেয়ারম্যান।
অনুষ্ঠানে শহীদ মীর মুগ্ধ’র বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আগামীদিনে যারাই সরকারে আসবেন, আমরা আশাকরি- তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য কিছু করবেন। আর শহীদ পরিবারের আগে গণ-অভ্যুত্থানে যারা আহত ও পঙ্গু হয়েছে-তাদের সুচিকিৎসা দরকার। শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন বলেন, আমার ভাইয়ের হত্যার সঙ্গে দু’জন পুলিশ জড়িত। সেটা সবাই দেখেছে। কিন্তু দেড় বছরেও কোনো বিচার হয়নি। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে আমরা ন্যায়বিচার পাবো বলে আশাকরি।
শহীদ গোলাম নাফিজ-এর বাবা গোলাম রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে আমরা মিটিং করেছি। বিচারের দাবি জানিয়েছি। কিন্তু দেড় বছর পরেও আমরা সঠিক বিচার পাচ্ছি না। এখন আমাদের কোনো নিরাপত্তা নেই। বিএনপি ক্ষমতায় আসলে আমরা যেন বিচার পাই। শহীদ মো. শাহরিয়ার হাসান আলভীর বাবা মো. আবুল হাসান বলেন, আমাদের সন্তানরা রাষ্ট্রের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে। কিন্তু ১৮ মাসে একটি বিচারও দৃশ্যমান দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের রক্তের উপরে এই সরকার গঠিত হয়েছে, এখন তারা আমাদের বিক্রি করছে। কেউ আমাদের কোনো খোঁজ নেন না।
মঞ্চে বক্তব্যে দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন শহীদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমা-তুজ জোহরা। তিনি বলেন, জুলাই শহীদ পরিবার ও আহতদের সঙ্গে বিএনপি কখনো পক্ষপাত করেনি। যাদের রক্তের উপরে এই সরকার গঠিত হয়েছে। সেই সরকারের আমাদের পাশে ছিলেন না। আমার ছেলের চিকিৎসা আমি করাতে পারিনি। কিন্তু স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সিঙ্গাপুরে গিয়ে চিকিৎসা নেন। বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে এবং সহ-দপ্তর সম্পাদক আবদুস সাত্তার পাটোয়ারির সঞ্চালনায় সভায় দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, আমরা বিএনপি পরিবারের আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমনসহ শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত ব্যক্তিরা বক্তব্য রাখেন।














