গণবিজ্ঞপ্তি কি নিরাপত্তা নাকি রাজনৈতিক হাতিয়ার?
চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করে তিন শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পুলিশের গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা নিঃসন্দেহে নজিরবিহীন ঘটনা। এটি কেবল চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ইতিহাসে নয়, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটেও একটি ব্যতিক্রমী ও প্রশ্নবিদ্ধ পদক্ষেপ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব- এতে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি যখন নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন প্রশ্ন তোলা নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের দায়িত্ব হয়ে যায়।
নির্বাহী ক্ষমতা বনাম বিচারিক প্রক্রিয়া
প্রথম প্রশ্ন হলো- পুলিশ কি নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করে কাউকে মহানগরীতে “ঢোকা ও অবস্থান নিষিদ্ধ” ঘোষণা করতে পারে? বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী এলাকা ত্যাগ বাধ্য করা বা প্রবেশ নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা সাধারণত ম্যাজিস্ট্রেট বা আদালতের। পুলিশ সেই আদেশ বাস্তবায়নকারী সংস্থা; আদেশদাতা নয়।
চট্টগ্রামে পুলিশ নিজেই তালিকা তৈরি করেছে, ঝুঁকি নির্ধারণ করেছে এবং শাস্তিমূলক পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। এটি কার্যত বিচারিক প্রক্রিয়ার বিকল্প হিসেবে নির্বাহী সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার শামিল, যা আইনের শাসনের মৌলিক ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
“সন্ত্রাসী” তকমা ও আইনের নিরপেক্ষতা
সিএমপি কমিশনার যাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছেন, তাদের “সন্ত্রাসী” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো- সন্ত্রাসী কে? আদালত না প্রশাসন?
তালিকায় চিহ্নিত অপরাধীর পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের নাম। বিশেষ করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এমনকি ভিন্ন মতাদর্শী ধর্মীয় সংগঠনের কারাবন্দি নেতার নামও যুক্ত।
এই মিশ্র তালিকা একটি গুরুতর আশঙ্কা তৈরি করে- রাজনৈতিক পরিচয় ও মতাদর্শ কি ঝুঁকি নির্ধারণের মানদণ্ড হয়ে উঠেছে? যদি তাই হয়, তবে এটি নিছক আইনশৃঙ্খলা উদ্যোগ নয়; বরং রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত।
নির্বাচন ও নিরাপত্তা: উদ্দেশ্য মহৎ হলেও পথ কি সঠিক?
আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে “শান্তিশৃঙ্খলা ও জানমালের নিরাপত্তা” রক্ষার যুক্তি দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা সবসময় সংবেদনশীল।
নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা ঠেকাতে শক্ত অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে শত শত মানুষকে কার্যত নির্বাসনে পাঠানো কি সহিংসতা কমাবে, না ক্ষোভ ও অবিশ্বাস বাড়াবে? রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে কি এতে আরও সংকুচিত করা হচ্ছে না?
“এক্সট্রা কাজ” নয়, প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধতা জরুরি
সিএমপি কমিশনার এটিকে “এক্সট্রা কাজ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আইনের শাসনে “এক্সট্রা কাজ” করার জায়গা নেই। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সবসময় সংবিধান, আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।
অতীতে ব্রাশফায়ারের নির্দেশ দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়া একজন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে এ ধরনের পদক্ষেপ এলে মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের উদ্বেগ স্বাভাবিক।
উপসংহার
নিরাপত্তা বনাম স্বাধীনতা-এই দ্বন্দ্বে রাষ্ট্রকে সবসময় সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। চট্টগ্রামের গণবিজ্ঞপ্তি সেই ভারসাম্যকে একপাশে ঠেলে দিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে যদি বিচারিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া হয়, এবং রাজনৈতিক পরিচয় ঝুঁকির মানদণ্ড হয়ে ওঠে, তবে তা শুধু অভিযুক্তদের অধিকার নয়- পুরো সমাজের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে।
রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় আইনের শাসনে, ভয় দেখানো তালিকায় নয়।
ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক














