শরিয়াহ থেকে সংবিধান: জামায়াতের ইউটার্ন
রাজনীতিতে ইউটার্ন নতুন কিছু নয়। সময়ের চাপ, সামাজিক বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক পরিবেশ এবং সর্বোপরি ভোটের অঙ্ক- সব মিলিয়েই রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অবস্থান বদলায়। কিন্তু প্রশ্ন তখনই গভীর হয়, যখন এমন পরিবর্তন আসে সেই দলগুলোর কাছ থেকে, যারা নিজেদের দীর্ঘদিন ধরে ‘আপসহীন আদর্শিক শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কটি ঠিক এখানেই এসে দাঁড়িয়েছে। শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন না করে রাষ্ট্র পরিচালনায় সংবিধান ও বিদ্যমান আইনি কাঠামো অনুসরণের ঘোষণা কি নিছক কৌশল, নাকি আদর্শিক রাজনীতিতে একটি মৌলিক পুনর্বিন্যাস?
খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকের পর জামায়াত আমিরের বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নের কোনো পরিকল্পনা নেই; দেশ চলবে সংবিধান ও প্রচলিত আইনের ভিত্তিতেই। একই সঙ্গে সব ধর্মের মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকারও উচ্চারিত হয়েছে। বক্তব্যটি তাৎপর্যপূর্ণ শুধু এই কারণে নয় যে এটি সংখ্যালঘুদের উদ্দেশে দেওয়া আশ্বাস, বরং এই কারণে যে এটি জামায়াতের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক বলে অনেকেই মনে করছেন।
জামায়াতে ইসলামী কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দল নয়। দলটির জন্ম, বিকাশ ও রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তা। প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীর ভাবনায় রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথকীকরণ ছিল না; বরং ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় প্রতিষ্ঠাই ছিল মূল লক্ষ্য। সে কারণেই জামায়াতের রাজনীতিতে শরিয়াহভিত্তিক আইনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব যখন প্রকাশ্যে সংবিধানভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার কথা বলে, তখন সেটিকে নিছক কৌশলগত বক্তব্য হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া সহজ নয়।
জামায়াতের সমর্থকেরা অবশ্য ভিন্ন যুক্তি দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, দলীয় আদর্শ আর রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো এক বিষয় নয়। একটি রাজনৈতিক দল ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাস করতে পারে, কিন্তু ক্ষমতায় গেলে সংবিধান ও আইন মেনেই সরকার চালাতে পারে। এই যুক্তির ভেতরে একটি বাস্তবতা আছে- গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংবিধানই সর্বোচ্চ আইন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আদর্শ ও শাসনব্যবস্থার মধ্যে কি সত্যিই এমন স্পষ্ট বিভাজন সম্ভব? ইতিহাস বলছে, একটি দলের আদর্শ তার নীতি নির্ধারণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতিফলিত হয়ই। ফলে সন্দেহের জায়গাটি থেকেই যায়: জামায়াত কি ক্ষমতায় গেলে আদর্শকে সত্যিই রাষ্ট্রীয় নীতির বাইরে রাখতে পারবে?
এই প্রশ্ন নতুন নয়। অতীতেও জামায়াতকে তার অবস্থান সংশোধন করতে দেখা গেছে। ২০১২ সালে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন সংক্রান্ত শর্ত পূরণের জন্য দলটি গঠনতন্ত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। ‘ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সংশোধন করে সেখানে ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠার কথা যুক্ত করা হয়। সে সময়ও বিতর্ক উঠেছিল- এটি কি আদর্শিক বিবর্তন, নাকি নিছক আইনগত বাধ্যবাধকতা? অনেকের মতে, সেদিন যেমন বাস্তবতার চাপে ভাষা বদলেছিল, আজও শরিয়াহ প্রশ্নে দেওয়া বক্তব্য সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট আরও জটিল। কারণ, এটি কেবল দলীয় গঠনতন্ত্রের ভাষাগত পরিবর্তন নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতির প্রশ্ন। সংবিধান বনাম শরিয়াহ- এই দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুদিনের। স্বাধীনতার পর থেকেই সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা, পরে তার পরিবর্তন, আবার আংশিক পুনঃস্থাপন- সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রশ্নে সমাজে গভীর সংবেদনশীলতা রয়েছে। এই বাস্তবতায় জামায়াতের বক্তব্যকে অনেকেই সংখ্যালঘু আস্থা অর্জনের কৌশল হিসেবে দেখছেন।
এ ক্ষেত্রে একটি বাস্তব দিক হলো, জামায়াত এবার নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুইজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন না করার ঘোষণাও সেই রাজনৈতিক বার্তারই অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংখ্যালঘুদের আস্থা শুধু বক্তব্যে অর্জিত হয় না। অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার দায় কোনো দলই পুরোপুরি এড়াতে পারেনি। জামায়াতের ক্ষেত্রেও সেই ইতিহাস একেবারে অপ্রাসঙ্গিক নয়। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়- এই আশ্বাস কি প্রতীকী, নাকি বাস্তব রাজনৈতিক অঙ্গীকার?
রাজনীতিতে অবস্থান বদলানো স্বাভাবিক। নির্বাচন সামনে এলে দলগুলো ভোটের সমীকরণ, জনমত ও আন্তর্জাতিক চাপ বিবেচনায় নিয়ে নিজেদের বক্তব্যে নমনীয়তা আনে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে জামায়াতের বর্তমান অবস্থানকে কৌশলগত ইউটার্ন বলা যায়। কিন্তু এখানেই জামায়াত অন্য দলগুলোর তুলনায় আলাদা হয়ে যায়। তারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে এসেছে, তারা ক্ষমতার রাজনীতি নয়, আদর্শের রাজনীতি করে। এই দাবির আলোকে প্রশ্ন ওঠে- যদি আদর্শই মুখ্য হয়, তবে বাস্তবতার চাপে আদর্শিক অবস্থান বদলানো কতটা গ্রহণযোগ্য?
অবশ্য একটি ইতিবাচক ব্যাখ্যাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কেউ কেউ মনে করছেন, জামায়াত অবশেষে বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। এ দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ হলেও কট্টরতা চায় না। সংবিধান ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ধারণা সমাজে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করে। যদি জামায়াত সত্যিই এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে নিজেকে পুনর্গঠন করতে চায়, তবে সেটিকে রাজনৈতিক পরিণতিবোধ হিসেবেই দেখা যেতে পারে। কিন্তু পরিণতিবোধ আর বিশ্বাসযোগ্যতা এক নয়। বিশ্বাসযোগ্যতা আসে দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক আচরণ থেকে।
শেষ পর্যন্ত জামায়াতকে বিচার করার একটাই মানদণ্ড আছে- কথায় নয়, কাজে। শরিয়াহ থেকে সংবিধানে আসার এই ইউটার্ন যদি কেবল নির্বাচনী বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার গুরুত্ব কমে যাবে। আর যদি এটি সত্যিই নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা হয়, তবে তার প্রতিফলন দেখা যাবে দলটির কর্মসূচিতে, প্রার্থী বাছাইয়ে, নারী ও সংখ্যালঘু বিষয়ে অবস্থানে এবং ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে।
এই মুহূর্তে জামায়াতের বক্তব্যকে পুরোপুরি বাতিল করাও যেমন যুক্তিযুক্ত নয়, তেমনি নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করাও বাস্তবসম্মত নয়। গণতন্ত্রে প্রশ্ন তোলা, সন্দেহ করা এবং যাচাই করা নাগরিক দায়িত্ব। জামায়াতের ইউটার্ন আদর্শের বদল, না ভোটের হিসাব- এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। তবে সেই সময়ের আগে প্রশ্ন করা বন্ধ করা যাবে না।
ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক














